বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ক্রপ জোনিংয়ের গুরুত্ব

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০৫

বাংলাদেশ খাদ্যোৎপাদনে বিগত ৫০ বছরে বিস্ময়কর সাফল্য প্রদর্শন করেছে। এমন কি বাংলাদেশ ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে। ম্যালথাস তার বিখ্যাত জনসংখ্যা তত্ত্বে বলেছিলেন, একটি দেশের খাদ্যোৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে অর্থাৎ ১,২,৩,৪,৫ এভাবে ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে অর্থাৎ ১,২,৪,৮,১৬ এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে। অন্যদিকে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে। একটি দেশের জনসংখ্যা প্রতি ২৫ বছরে দ্বিগুণ হবে। কাজেই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য এবং অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য কৃষি নয়, শিল্পের ওপরই জোর দিতে হবে। শিল্পে সমৃদ্ধ হতে পারলে জনগণের চাহিদাকৃত খাদ্য আমদানির মাধ্যমেও পূরণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ম্যালথাসের এই বহুল আলোচিত জনসংখ্যা তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ। গত ৫০ বছরে জনসংখ্যা ২ দশমিক ২৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশের খাদ্যোৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। যদিও এই সময়ে দেশের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছে। ১৯৭১ সালে দেশে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর। বাড়িঘর নির্মাণ, শিল্প-কারখানা স্থাপন, অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ সমাপণ ইত্যাদি কাজে প্রতি বছর ৬০ হাজার হেক্টর জমি চাষের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ২২ লাখ করে। এই বিপরীতমুখী অবস্থায় খাদ্যোৎপাদন এতটা বৃদ্ধি পাওয়া সত্যি বিস্ময়কর। অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও উন্নতি এবং অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। যেমন :দেশের জনগণের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১৯৭২-১৯৭৩ অর্থবছরে ৯৪ মার্কিন ডলার, যা ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭২-১৯৭৩ অর্থবছরে দেশে কলকারখানার সংখ্যা ছিল ৩১৩টি, যা ২০১৯ সালে তা ৪৬ হাজার ২৯১টিতে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ২০ শতাংশে নেমে আসে।

বর্ণিত সময়ে বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই সাফল্য প্রদর্শন করেছে। তবে কৃষি খাতের সাফল্য বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। বাংলাদেশের কৃষি খাত সবচেয়ে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। ম্যালথাস তার জনসংখ্যা তত্ত্ব প্রণয়নকালে প্রযুক্তির উৎকর্ষের বিষয়টি সম্ভাব্যতা বিবেচনায় রাখেননি। কৃষি প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি সাধিত হবার কারণেই মূলত খাদ্যোৎপাদন এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ৫০ বছরে দেশে খাদ্যোৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে কিন্তু আমরা এখনো খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৮ বছরে দেশে মোট খাদ উৎপাদিত হয়েছে ২৯ কোটি ২৭ লাখ মেট্রিক টন। আর একই সময়ে খাদ্য আমদানি করা হয়েছে ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন। আমরা এখনো খাদ্য হিসেবে ভাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তুলনামূলক সস্তা এবং অধিকতর পুষ্টিকর অনেক খাদ্য আছে, যা ভাতের বিকল্প হতে পারে। আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। যদিও এখনো পুরো কৃষি ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণভাবে যান্ত্রিকায়নের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। তারপরও যে অগ্রগতি এই খাতে সাধিত হয়েছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। সীমিত পরিসরে হলেও বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাপনার নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা পরিষদ নানা জাতের প্রচুর ভ্যারাইটিজ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং স্বল্পসময়ে পরিপক্ব হয়। রোপণ বা বপন থেকে শুরু করে ফসল পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত সময় অনেক হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে এক ফসলি জমির পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। দুই ফসলি এবং তিন ফসলি জমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি এবং দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া যে কোনো ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এখানে মাটিতে যে কোনো বীজ বপন করলেই ফসল উৎপাদিত হয়। দেশের আবহাওয়া ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। তবে দৃশ্যমান বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা এই খাতের উৎপাদন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থায় এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। কৃষক উৎতরাধিকার সূত্রে লব্ধঅভিজ্ঞতাকে সম্বল করে চাষাবাদ করে থাকে।

কৃষি উৎপাদন বিষয়ে তাদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে। ফলে তারা উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করতে পারছেন না। দেশে শিক্ষিত কৃষকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। যারা কৃষি কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তাদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত এবং অপ্রশিক্ষিত। প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষা ব্যতীত কোনো কাজেই সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করা যায় না। কিন্তু কোনো কতৃ‌র্পক্ষই গ্রামীণ কৃষকদের প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করছেন না। কৃষক পরিবারের সন্তান, যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন তারাও পৈতৃক পেশা গ্রহণ করছেন না। তারা গ্রামে থেকে কৃষি কাজ করার চেয়ে শহরে এসে কেরানির চাকরি করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কৃষক পরিবারের যেসব সন্তান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছেন, তারা যদি পৈতৃক পেশায় ফিরে যেতেন, তাহলে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো। একজন অশিক্ষিত এবং অপ্রশিক্ষিত কৃষকের পক্ষে জমির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ফসল বপন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সাধারণত চার ধরনের মাটির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এগুলো হচ্ছে, বেলে মাটি, দোআঁশ মাটি, বেলে দোআঁশ এবং এঁটেল মাটি। এর মধ্যে দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটিতে ফসল ভালো হয়। কিন্তু সব ক্যাটাগরির মাটিতে একই ফসল ভালো হয় না। সব এলাকাতেও একই রকম ফসল ভালো জন্মে না। যেমন, গাজিপুরের টঙ্গি এলাকায় কাঁঠাল ভালো জন্মে। আবার মুন্সিগঞ্জে গোল আলুর আবাদ ভালো হয়। আমরা যদি জমি থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রত্যাশা করি, তাহলে, টঙ্গিতে কাঁঠাল এবং মুন্সিগঞ্জে গোল আলুর আবাদ করতে হবে। মুন্সিগঞ্জে কাঁঠাল এবং টঙ্গিতে গোল আলু আবাদ করা হলে নিশ্চয়ই কাম্যস্তরে উৎপাদন আশা করা যায় না। কিন্তু এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের দেশের কৃষকরা প্রায়শই ভুলে যান। তারা মনে করেন, যে কোনো জমিতে ফসল বপন করলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। এই মুহূর্তে আমরা যদি জমি থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রত্যাশা করি তাহলে জাতীয়ভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে ‘ক্রপ জোনিং’ করতে হবে। ক্রপ জোনিং বিষয়টি এই রকম—যে এলাকার মাটি যে ফসল উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সেই এলাকায় সংশ্লিষ্ট ফসল বপনের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্রপ জোনিং হতে পারে জেলাভিত্তিক, হতে পারে উপজেলাভিত্তিক এমনকি ইউনিয়নভিত্তিক হতে পারে। প্রতিটি এলাকার মাটির গুণাগুণ এবং চরিত্র বিশ্লেষণ করে কী ফসল ভালো উৎপাদিত হতে পারে তা নির্ধারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে কৃষকদের চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে চায়ের বাগানে বেল গাছ বপন করা হলে কখনোই উৎকৃষ্ট ফলন আশা করা যাবে না। ক্রপ জোনিং দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শহরের মতো গ্রামাঞ্চলেও পরিকল্পিতভাবে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চলে কোনো পরিবারে তিন সন্তান থাকলে তারা পৃথক হয়ে যাবার পর মূল বাড়ি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এলাকায় গিয়ে তিনটি বড় বাড়ি তৈরির চেষ্টা করেন। বিত্তবান পরিবারগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। এতে আবাদি জমি অপচয় হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামাঞ্চলে আধুনিক সুবিধা সংবলিত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্যোগটি ছিল এমন, গ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো বাড়িঘর নির্মিত হবে না। সবার জন্য আধুনিক সুবিধাসংবলিত কোয়ার্টার নির্মাণ করা হবে। গ্রামের মানুষ সেই আবাসিক এলাকায় বসবাস করবেন। অনেকটা গুচ্ছ গ্রামের মতো। গ্রামীণ আবাসন আইন প্রণয়ন করে বিচ্ছিন্নভাবে বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। গ্রামেও বহুতল বিশিষ্ট হাইরাইজ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রামে বিশাল এলাকা জুড়ে বাড়ি নির্মাণ করা হয়। এতে জমির অপচয় হয়। এটা রোধ করতে হবে। দেশের এক ইঞ্চি জমিও অব্যবহূত রাখা যাবে না। গ্রামাঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক ডোবা-নালা এবং পুকুর পতিত পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে চাষের আওতায় আনা যেতে পারে। এসব পুকুর-জলাশয়ে মাছ এবং হাঁস এবং পুকুর পাড়ে সবজি চাষ করা গেলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর আর্থিক দীনতা অনেকটাই দূর হতে পারে। আগামী ১০০ বছরকে বিবেচনায় রেখে আমাদের জাতীয় কৃষি এবং ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আমরা যদি এখনই এই উদ্যোগ গ্রহণ না করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা ভয়াবহ খাদ্যসংকটে পতিত হতে পারি। আর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্হিতির সৃষ্টি হলে আমাদের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাঁশ নিয়ে ভাবনা আর না 

গবেষণা নিয়ে সাম্প্রতিক উপলব্ধি ও কিছু পরামর্শ 

দরিদ্র ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রসঙ্গে 

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ