বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার: নির্দেশনা মানা হোক 

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:১৬

প্রকৃতির স্বভাবিক নিয়মানুযায়ী শিশুর জন্য মায়ের দুধ সর্বোৎকৃষ্ট খাবার। বহুমাত্রিক দিক বিবেচনায় মায়ের দুধ সর্বোত্তম। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য উপাদান যতটুকু প্রয়োজন তার সবটুকু মায়ের দুধে বিদ্যমান আছে। মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য সহজপ্রাচ্য সহজলভ্য সহজসাধ্য। তাই এর উপযোগিতা বর্ণনাতীত। মায়ের দুধ পানে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই যেমন— এলার্জিজনিত সমস্যা, পেটের অসুখ, শারীরিক দুর্বলতা, দাঁত ও মাড়ির ক্ষয় সমস্যাসহ জটিল রোগ থেকে রেহাই পেতে পারে।

মায়ের বুকের দুধ পানকারী শিশু সুস্থ-সবল-মেধাবী-দক্ষ সহনশীল মমতাময়ী নিয়মানুবর্তী, ইতিবাচক গুণাবলির অধিকারী হয়ে থাকে। এটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশেষ করে শাল দুধে অধিক পরিমাণে প্রোটিন এবং স্বল্প শর্করা ও অন্যান্য অনেক স্নেহ পদার্থ থাকে। এটি শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি করে জীবনীশক্তি তথা শরীর মন দুটিকে সতেজ-সুস্থ-সবল রাখে। শিশুকে কোলে নিয়ে দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু উভয়ের শারীরিক-মানসিক উন্নতি হয় এবং মা ও শিশুর মধ্যে মায়া-মমতা, প্রেম-ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার সেতু বন্ধন তৈরি হয়।

তাই শিশুর দুধপানের বিষয়ে অধিক যত্নশীল, নিরাপদ, শঙ্কাহীন ও অনুকূল পরিবেশ থাকা বাঞ্ছনীয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে শিশুর প্রতি অবিচার করা হবে। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন, বঞ্চনা ও মৌলিক অধিকার হরণের মতো জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। অস্বস্তিকর ও উত্তেজিত পরিবেশে অধৈর্য ও অশান্িত নিয়ে দুধ পান করাতে থাকলে ক্রমশ মায়ের বুকের দুধের পরিমাণ কমতে থাকে এবং এমনকি শিশুর মধ্যে অতৃপ্তি জন্মায়। একটা সময় ছিল যখন নারীরা বেশির ভাগ সময় গৃহের অভ্যন্তরেই সময় কাটাতেন। তখন শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতেন। এতে তাদের কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। গৃহের কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় সুযোগ মতো ইচ্ছানুযায়ী শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সমাজ বাস্তবতা তথা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এখন মানুষের চিন্তা-চেতনা, কর্ম-কৌশল, জীবনমান, চাহিদা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, পেশা ইত্যাদিতে বৈচিত্র্য এসেছে। উন্নতি প্রগতি, শান্িত ও সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে মানুষ নিরন্তর ছুটে চলছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এখনো কর্মসূত্রে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। অফিস-আদালতে বলতে গেলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা। বর্তমানে লাখ-লাখ নারী বাইরে কাজ করছেন। তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকেন তিন মাস বা ছয় মাস। এরপর শিশুদের দেখাশোনা ও পরিচার্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্ব স্ব¼ কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে হয়। ফলে তার শিশুটিকে উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে বুকের দুধ খাওয়াতে চরম দুর্ভোগ ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়।

শিশুদের দুই বছর মায়ের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম। এছাড়া শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার সংবিধানের দ্বারা স্বীকৃত। বাংলাদেশে শিশু অধিকার সংরক্ষণের জন্য স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরপরই ১৯৭৪ সালে শিশু আইন ১৯৭৪ পাশ হয়। রয়েছে জাতীয় শিশুনীতি ২০১১। এসব আইন ও বিধিতে শিশুর সার্বিক সুরক্ষা ও সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ভাবিষ্যত্ প্রজন্মের পুষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীকে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে এবং সুস্থ সবল ভবিষ্যত্ প্রজন্মের স্বার্থে ২০০৯ সালে দেশের কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের নির্দেশনা দেন। এর প্রায় এক যুগ কেটে গেলেও এই প্রত্যাশা পূরণের জায়গাটি এখনো সুদূরপরাহত।

২০১৯ সালে ৯ মাসের শিশু উমাইর বিন সাদীকে নিয়ে তার মা আইনজীবী ইসরাত জাহান রিট করেন, রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে কর্মক্ষেত্রে, বিমানবন্দরে, রেলস্টেশনে ও শপিংমলে মাতৃদুগ্ধ দানকক্ষ ও বেবী কেয়ার সেন্টার স্থাপনের জন্য ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ জারি করণে মহামান্য আদালত। এই রুলের প্রেক্ষিতে ১১-১২টি ব্রেস্ট-ফিডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ছিল শাহজালাল বিমানবন্দরসহ কয়েকটি রেলস্টেশনও। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি কারখানায় বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে বিষয়টি মানা হচ্ছে কিনা তা মনিটরিংয়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ কর্মস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার আছে বলে জানা যায়। ৭০ শতাংশ কর্মক্ষেত্রেই মানা হয়নি নির্দেশনা। অথচ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ব্যত্যয় হলে উভয়ের স্বাস্থ্য সম্পদের ওপর আঘাত আসবে। অপূরণীয় ক্ষতিতে পতিত হবে আমাদের আগামী প্রজন্ম। তাতে আলোকিত সমাজ বিনির্মাণ ব্যাহত হবে।

বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ড. এস.কে রায়ের মতে, চিকিৎসকের ফমু‌র্লা দুধের নাম দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য বিপণন নীতিমালা আইন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। এই আইনানুযায়ী কোনো চিকিৎসক প্রসূতি মাকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোনো দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারবেন না। এটা করলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল হবে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে চিকিৎসকরা প্যাডে নয়, অন্য কাগজে ফর্মুলা দুধের নাম লিখে দিচ্ছেন হরহামেশাই।

একটি সুখী-সমৃদ্ধি, সুস্থ-সবল, মেধাবী জাতি গঠনের স্বার্থে তথা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে আমলে এনে স্থাপন করতে হবে ডে কেয়ার বা শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র যেখানে একটি শিশু নিরাপদ আশ্রয়ে তার অধিকারটুকু ভোগ করতে পারবে। পার্ক, রেল স্টেশন, লঞ্চ-ফেরিঘাট, বিমানবন্দর, শপিংমল ও যাত্রী ছাউনিগুলোতে ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।

লেখক: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি ইস্পাহানী কলেজ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাঁশ নিয়ে ভাবনা আর না 

গবেষণা নিয়ে সাম্প্রতিক উপলব্ধি ও কিছু পরামর্শ 

দরিদ্র ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রসঙ্গে 

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ