মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১১ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনৈতিক সংকট লইয়া নীতিনির্ধারকদের ভাবিতে হইবে

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:৩৮

গত দুই বৎসরের অধিক সময় ধরিয়া করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত সমগ্র বিশ্ব। এই মহামারি বিশ্বের জীবনব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়াছে। একদিকে মহামারির প্রত্যক্ষ প্রভাবে টালমাটাল সমগ্র বিশ্ব, অন্যদিকে ইহার পরোক্ষ প্রভাবে যেই সকল নূতন নূতন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আবির্ভূত হইয়াছে, তাহা জনজীবনকে আরো অস্থির করিয়া তুলিতেছে। করোনার অভিঘাতে বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বে কর্মসংস্থান হারাইয়াছে লাখ লাখ মানুষ, কর্মসংস্থান হারাইয়া দরিদ্র হইবার ঝুঁকিতে রহিয়াছে আরো কয়েক কোটি মানুষ। কর্মের অভাবে দিন দিন বাড়িয়া যাইতেছে বেকারত্বের সংখ্যা। কেবল করোনা মহামারিকালীনই নহে, ভবিষ্যতে যে এই সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করিবে, তাহা বলাই বাহুল্য।

একদিকে করোনা মহামারির কারণে উত্পাদনমুখী শিল্প কলকারখানাগুলিতে সীমাহীন সংকট বিরাজ করিতেছে, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হইতেছে। ইহার ফলে উদ্যোক্তারা সময়মতো ব্যাংকের ঋণ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলসহ নানাবিধ বিল পরিশোধ করিতে পারিতেছেন না। বাধ্য হইয়া তাহাদের কর্মী ছাঁটাই করিতে হইতেছে, এইভাবে কর্মহীন হইতেছেন হাজার হাজার কর্মী। কিন্তু ইহা তো কোনো টিকসই সমাধান নহে। কঠিন এই সংকট অব্যাহত থাকিলে আগামী দিনে উত্পাদনমুখী কলকারখানা রুগ্ণ হইয়া পড়িবে, স্থবির হইয়া পড়িবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। অথচ দেশ ও অর্থনীতির এই গভীর সংকট লইয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা ভাবিতেছেন না। দেখা যাইতেছে সেই সকল দেশে প্রকল্পের পর প্রকল্প হাতে লওয়া হয়, কিন্তু তাহারা হিসাবও করিয়া দেখিতেছেন না কোন কোন প্রকল্পে লোকসান হইতেছে কিংবা কোন কোন প্রকল্প ঠিকমতো চলিতেছে না। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, রেলওয়ে কারখানার জন্য মেশিন আমদানি করা হইলেও তাহা ফেলাইয়া রাখা হইয়াছে। উহা স্থাপন করা তো দূরের কথা, খোলাও হয় নাই। এই ধরনের অপচয় এবং লোকসানের দৃষ্টান্ত অগণিত।

আমরা দেখিতে পাই করোনার অভিঘাতে সমগ্র পৃথিবীতেই এক নিদারুণ সংকটের সৃষ্টি হইয়াছে। আমেরিকার মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশও স্বীকার করিতেছে যে, করোনার কারণে তাহাদের অর্থনীতি স্থবির হইয়া পড়িয়াছে। সমগ্র পৃথিবীতে করোনাকালীন এবং পরবর্তী সময়ের এই সংকট-সমস্যা ও প্রতিকূলতাকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলি স্বীকার করিয়া লইতেছে, এবং উহা মোকাবিলা করিবার লক্ষ্যে তাহারা প্রতিনিয়ত আলোচনা অব্যাহত রাখিয়াছে। করোনার কারণে বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মহামন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে তাহা সামলাইবার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের কোনো নেতৃবৃন্দের মুখে এই সংকটের কথা শোনা যাইতেছে না, তাহারা যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে লইয়া বসিয়া রহিয়াছে, যাহার কারণে বৈশ্বিক কোনো সমস্যা সংকট তাহাদের স্পর্শ করিতে পারিতেছে না।

উন্নয়নশীল দেশগুলির নীতিনির্ধারকগণ প্রায়শই বড় গলায় বলিয়া থাকেন, দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়াইয়া গিয়াছে, অথচ শিল্প কলকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না, উপরন্তু তাহাদের উপর আসে ঋণখেলাপি ঘোষণা করিবার হুমকি। এই সংকটের সমাধান না হইলে কলকারখানাগুলি যে মুখ থুবড়াইয়া পড়িবে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কলকারখানাগুলি ঠিকমতো চলিতেছে কি না, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রহিয়াছে কি না, তাহা উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতিনির্ধারকগণ চোখ খুলিয়া দেখেন না। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ইউ ক্যান ফুল আদার্স বাট নট ইয়োরসেলফ। সুতরাং এই সকল সংকট-সমস্যার বিষয়ে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশের নেতৃবৃন্দকে গভীরভাবে নজর দিতে হইবে, দেশের যতটুকু সম্পদ রহিয়াছে, সেটির সুষ্ঠু সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করিয়া উত্পাদনমুখী রাখিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সড়কে বিশৃঙ্খলা আর কত দিন?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ দায়িত্ব পালন

প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক হওয়া উচিত

অস্পষ্টতা গুজব সৃষ্টির সহায়ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত