বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:৪৬

ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টর ফর ইকোনোমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ তাদের সর্বশেষ এক রিপোর্টে আভাস দিয়ে বলেছেন যে, বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০২১’ নামের এই রিপোর্টে আরো বলা হয়, আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বহু ধাপ ওপরে উঠে পৌঁছে যাবে ২৫ নম্বরে। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

এভাবে গত এক দশক যাবৎ বাংলাদেশ আপন গতিতে এগিয়ে চলছে। আর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। নিজস্ব দক্ষতা-অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ‘সবার সথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। এটাই হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি। আধুনিক বিশ্বে প্রত্যেক রাষ্ট্র একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য অপর রাষ্ট্রের সঙ্গে অনুরূপ সম্পর্ক স্থাপন করে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক। এক্ষেত্রে আর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশের স্বার্থেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করেই এগিয়ে যেতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম যুব শ্রমশক্তি, যেখানে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

একবিংশ শতাব্দীর কাজের জন্য যেসব বিষয়ে দক্ষতার প্রয়োজন হবে, পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের সেসব বিষয়ে দক্ষ করে তোলার ক্ষেত্রে অন্য বেশ কয়েকটি অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া এক্ষেত্রে ভবিষ্যতের যে পূর্বাভাস রয়েছে, সেখানেও বৈশ্বিক গড় অবস্থানের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে। আগামী ২০৩০ সালে শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের সম্ভাব্য অবস্থা নিয়ে এডুকেশন কমিশনের সঙ্গে মিলিয়ে ইউনিসেফ যে হিসাব দাঁড় করিয়েছিল তার ওপর তাদের বাংলাদেশকে আরো দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেছেন, ‘প্রতিদিন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, যাদের একত্রিত করলে একটি বিশাল খেলার মাঠের সমান হবে। এদের প্রায় অর্ধেকই একবিংশ শতাব্দীর কাজের জন্য সঠিক পথে নেই। দক্ষিণ এশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে সীমিত সময়ে তাদের মেধাবী ও কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে জনসংখ্যাগত উল্লেখযোগ্য সুবিধা তুলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগালে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আর এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে, তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং মেধা অন্য অঞ্চলগুলোতে হারিয়ে যাবে।’

দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে প্রায় ১৮০ কোটির বেশি মানুষ বাস করছে। এই জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকের বেশি ২৪ বছরের কম হওয়ায় ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তরুণ জনশক্তি থাকবে দক্ষিণ এশিয়াতেই। এই সুযোগ অত্র অঞ্চলের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত ও উত্পাদনমুখী অর্থনীতির পথে চালিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ জোরদার করা হলে এই অঞ্চল শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে এবং একই সঙ্গে আগামী দশকগুলোতে শিক্ষা ও দক্ষতা খাতে সুযোগ প্রসারিত হবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ৩২ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত ইউনিসেফের ‘ভয়েসেস অব ইয়ুথ’ শীর্ষক সাম্প্রতিক জরিপে ২৪ বছরের কমবয়সি এই তরুণদের আধুনিক অর্থনীতির জন্য কতটা ভালোভাবে তাদের প্রস্ত্তত করা হচ্ছে তা নিয়ে তাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার অনেক তরুণ মনে করে, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেকেলে এবং এটা কর্মসংস্থানের জন্য তৈরি করে না। তারা এমনকি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পরও কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে মূল বাধা হিসেবে কাজ করছে অভিজ্ঞতার ঘাটতি (প্রায় ২৬ শতাংশ), নিয়োগযোগ্যতা উন্নয়নে অপর্যাপ্ত সহায়তা সেবা (২৩ শতাংশ কোনো সহায়তা পায় না এবং বেশির ভাগই সমন্বিত সেবার পরিবর্তে খুবই সীমিত পরিসরে (সেবা পায়) এবং ঘুষ/বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্যায়ভাবে বা পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার (৪৪ শতাংশ) কথা উল্লেখ করে। গ্লোবাল বিজনেস কোয়ালিশন ফর এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক জাস্টিন ভ্যান ফ্লিট বলেছেন, ‘এটি একটি সংকট। দ্রুত বদলে যাওয়া শ্রমবাজারে সফলতার সঙ্গে প্রবেশের জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে সবচেয়ে ভালোভাবে তৈরি করতে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের দক্ষতায় যে ঘাটতি রয়েছে তা নিরসনে সরকারি বিনিয়োগ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি, নাগরিক সমাজের অবদান এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।’

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থসামাজিক খাতে বেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এটি অবশ্য একটা ইতিবাচক দিক। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনও এসেছে। মাথাপিছু আয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, যেখানে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৮২৭ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে ৬৬ পয়েন্টের প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচকে কোনো দেশের পয়েন্ট দেশের পয়েন্ট ৩৬-এর বেশি হলে সেই দেশকে এলডিসিভুক্ত রাখা হয়, ৩২-এ আসার পর উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন হয়। সেখানে বাংলাদেশের পয়েন্ট এখন ২৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। এক কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশ এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে এই তৃপ্তি নিয়ে বসে থাকলেই চলবে না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে আরো অনেক দূর। প্রতিবেশী, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশেগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করে বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ অন্যান্য খাতে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাঁশ নিয়ে ভাবনা আর না 

গবেষণা নিয়ে সাম্প্রতিক উপলব্ধি ও কিছু পরামর্শ 

দরিদ্র ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রসঙ্গে 

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ