শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে মানবন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একইসাথে শাবিপ্রবি প্রশাসনের অনিয়মেরও নিন্দা জানিয়েছেন তারা।
ইত্তেফাকের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানান, সোমবার (১৭ জানুয়ারি) বেলা ১২টায় জাবির কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে এক মানববন্ধন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাকিবুল রনি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকা সত্বেও সরকার অন্ধ সমর্থন দিয়েছেন। তবে আশা করি, শাবিপ্রবির উপাচার্যের বিরুদ্ধে সরকার অন্ধ সমর্থন দেবেন না।
চারুকলা বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী দিপঙ্কর চক্রবর্তী দ্বীপ বলেন, শিক্ষার্থীরা যখনই যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করে, তখন পুলিশ ডেকে এনে তাদের উপর হামলা করানো হয়। আজকের মানববন্ধন থেকে শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছি, পাশাপাশি তাদের যোক্তিক দাবির সাথে একাত্বতা পোষণ করছি।
মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু রায়হান কবির রাসেলের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাপসী দে প্রাপ্তি ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইসফার সাদি প্রমুখ।
ইত্তেফাকের চবি সংবাদদাতা জানান, শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে এবং তাদের আন্দোলনের সাথে সংহতি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১৭ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, 'যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এহেন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য না। পুলিশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়ে ভিসি তার পদে থাকার নীতিগত অধিকার হারিয়েছেন। আমরা এই কর্মসূচি থেকে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের সকল দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ভিসির পদত্যাগ দাবি করছি।'
গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একই ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। ইত্তেফাকের বশেমুরবিপ্রবি সংবাদদাতা জানান, সোমবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু অ্যাকাডেমি ভবনের সামনে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শাবিপ্রবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তা বর্বরোচিত। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পাশবিকতা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সকলে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের পাশে আছি, তাদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি। শীঘ্রই হামলার ঘটনায় স্বৈরাচারী ভিসিসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় সারাদেশের শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
এদিকে শাবিতে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি নিন্দা জানিয়েছে। ইত্তেফাকের হাবিপ্রবি সংবাদদাতা জানান, সোমবার (১৭ জানুয়ারি) হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক যোবায়ের ইবনে আলী স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদলিপিতে এই নিন্দা জানানো হয়।
যৌথ বিবৃতিতে হাবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মো: মিরাজুল আল মিশকাত এবং সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান বলেন, ‘শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে পুলিশের ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। ক্যাম্পাসে যেভাবে গুলি, টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করা হয়েছে তাতে আমরা হতভম্ব হয়েছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শাবিপ্রবি প্রশাসন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য শাবিপ্রবি প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে এই পুলিশি হামলার বিচার করতে হবে।’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ বাহিনীর হামলায় ধিক্কার জানাই। আগামীতে যেন শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো মহল আঙ্গুল তুলতে না পারে, সেজন্য এ হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করার দাবি জানাচ্ছি।
অন্যদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমাবেশে বলেন, 'একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপর ন্যক্কারজনক হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়না। স্বাধীন দেশে নির্বিচারে পুলিশ দেশের সম্পদের ওপর কীভাবে গুলি চালায় তা বোধগম্য হয় না।'
এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শাবিপ্রবির চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ জানুয়ারি রাতে শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে হলটির ছাত্রীরা প্রতিবাদ জানান। ওই প্রভোস্ট খারাপ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দিক থেকে সাড়া না পাওয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ১৫ জানুয়ারি আন্দোলনরতদের ওপরে হামলার অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এসময় হামলার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সড়ক অবরোধ করেন।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে গতকাল রবিবার (১৬ জানুয়ারি) বেলা পৌনে তিনটার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ নিজ কার্যালয় থেকে বের হলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। এ সময় উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরে পুলিশ এসে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসময় অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থীসহ অনেকে আহত হন। এ ঘটনার পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে ১৭ জানুয়ারি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ না করে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
পরে রাতে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হল প্রভোস্টের পদে অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সোমবার শিক্ষার্থীরা শাবিপ্রবি উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় তারা শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টার ত্যাগ করতেও অনুরোধ করেন।

শাবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে ঢাবি, জাবি ও ইবিতে বিক্ষোভ
উপাচার্য অফিসে তালা দিলেন শাবির শিক্ষার্থীরা