বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৪২

বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৭৭০ কোটির অধিক। তাহার মধ্যে আন্তর্জাতিক অভিবাসীর সংখ্যা সাড়ে তিন ভাগ বা ২৭ কোটি ২০ লক্ষ। সবচাইতে অধিক অভিবাসী প্রেরণ করিতেছে ভারত। বিদেশে তাহাদের কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লক্ষ। এই পরিসংখ্যান হইতে আমরা বিশ্ব অভিবাসীর গতিধারা সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসী দল এক-এক করিয়া যাইতেছে উন্নত বিশ্বে উন্নত জীবনের আশায়। যেই সকল দেশ পূর্ব হইতেই উন্নত বা নূতন করিয়া উন্নতি লাভ করিতেছে, সেই সকল দেশের নাগরিকগণ এখন আর অড জব বা ছোটখাটো কাজ করিতে চাহেন না। উন্নয়নের গতি বাড়াইতে হইলেও দরকার নতুন লোকবল। যেইহেতু এই সকল দেশে জন্মহার সন্েতাষজনক নহে, এই জন্য এই প্রকৃতির কাজ করিতে তাহারা অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল। উন্নত দেশগুলিতে জন্মহার কতটা কমিতেছে এখানে তাহার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ব্রিটেনে একজন নারীর সন্তান জন্মদান সক্ষমতার হার এখন মাত্র ১.৬৫ শতাংশ। দেশটিতে জনসংখ্যার ক্রম নিম্নগামীতে অনেকেই উদ্বিগ্ন ও হতাশ।

গত ১২ জানুয়ারি ব্রিটেনের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস) জানাইয়াছে, গত এক দশকে ব্রিটেনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে মাত্র ৭ শতাংশ। ২০৩০ সাল নাগাদ তাহা হইবে মাত্র ৩ শতাংশ। এই সময় ৮৫ বৎসর বা তাহার অধিক বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাইবে। ২০৪৫ সালের মধ্যে তাহাদের সংখ্যা দাঁড়াইবে ৩০ লক্ষাধিক। দেশটিতে কর্মক্ষম মানুষের এই সংখ্যা হ্রাসের ফলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়াছে। উন্নয়নের গতি হ্রাস পাইতেছে। বয়স্ক নাগরিকদের দেখাশুনার লোক পাওয়া যাইতেছে না। রাষ্ট্র তাহাদের যত্ন-আত্তির দায়িত্ব লইলেও বিদেশ হইতে প্রয়োজন হইতেছে বাড়তি জনবল। শুধু ইউরোপের দেশ নহে, গত এক দশকে আমেরিকার জন্মহারও কমিয়াছে। ২০১৯ সাল নিবন্ধিত আমেরিকার ১৫ হইতে ৪৫ বত্সর বয়সি নারীর মধ্যে শিশু জন্মদানের সংখ্যা মাত্র ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন। বিশ্বের সবচাইতে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড। বিশ্বমানের জীবনযাত্রার জন্য দেশটি বিখ্যাত; কিন্তু সেখানেও কর্মজীবী মানুষের সংকট চলিতেছে। দেশটির জনসংখ্যা কম হইবার কারণে সেখানে মানুষের নূতন নূতন অভিবাসন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। জন্মহার নিম্নগামী এই সকল দেশে সরকারি সেবা অব্যাহত রাখিতে ও পেনশনের ঘাটতি পূরণে বিদেশি জনবল প্রয়োজন। নাগরিকদের মধ্যে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব থাকিলেও সরকার ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি বাস্তবতা উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন। উন্নত এই সকল দেশকে আরো আকর্ষণীয় ও উন্নত করিতে তাই ‘ট্যালেন্ট বুস্ট’ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হইতেছে।

অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ হইতে অভিবাসী গ্রহণ যেইহেতু দরকার, সেইহেতু নিয়োগদানকারী দেশের নাগরিকগণ এই সকল অভিবাসীর সহিত অসদাচরণ করেন কেন? মধ্যপ্রাচ্যে এমন দেশও আছে যেইখানে বিদেশি গৃহকর্মী ও কলকারখানার শ্রমিকদের উপর অত্যাচার করা হয়। অত্যাচারে অনেকের মৃতু্যও ঘটে। যাহাদের ছাড়া আরাম-আয়াস করা চলে না কিংবা দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না, তাহাদের সহিত এমন অমানবিক আচরণ করা কি যুক্তিযুক্ত ও বিবেচনাপ্রসূত? আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, নিজ দেশের কর্মীদের ঘণ্টাপ্রতি কাজের জন্য যেই পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তাহা এই সকল হতভাগ্য অভিবাসীর কপালে জোটে না। আমাদের বক্তব্য হইল, যেইখানে একই ধরনের কাজের জন্য ঘণ্টাপ্রতি পারিশ্রমিক ১৫ ডলার, সেইখানে তাহাদের পারিশ্রমিক দুই-তিন ডলার হইবে কেন? ইহা ১০ ডলার হইলেও কথা ছিল না। এই যে অভিবাসীদের সহিত কোনো কোনো উন্নত দেশ বিরূপ আচরণ করিতেছে ও বৈষম্যের আশ্রয় লইতেছে, তাহা নিরসনে আমাদের কি কোনো উদ্যোগ আছে? আমরা কি সেই সকল দেশের কূটনীতিকদের সহিত আলাপ-আলোচনা করিয়া ইহার সমাধান করিতে পারি না? রেমিট্যান্স বৃদ্ধির স্বার্থে বিষয়টি লইয়া দেশের ঊর্ধ্বতন ও সংশ্লিষ্ট মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত। 

 

 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়

সামনের দিনগুলি অনিশ্চয়তার