বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:০০

মানুষ সভ্যতা গড়িয়া তুলিবার পর হইতে প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে; ক্রমেই জ্ঞানবিজ্ঞানের দ্বার উন্মোচিত হইতেছে। কখনো কখনো উহা দেখিয়া আমরা অতি বিস্ময় প্রকাশ করিয়া থাকি। জ্ঞানবিজ্ঞানের উপর পূর্ণ ভরসা তৈরি হয়। সম্প্রতি হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করিয়াছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাহাকাশ বিজ্ঞানীরা, যাহা ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে গিয়া পৌঁছাইবে আগামী ২৩-২৪ জানুয়ারি। তাহার পাঁচ মাস পর হইতে এই টেলিস্কোপ হাই ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করিবে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সহিত।

বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, এই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুর দিকের ছবিও দেখাইতে পারিবে! গ্রহ-নক্ষত্রের গঠন, পৃথিবীর বাহিরে প্রাণের অনুসন্ধানের কাজে নিয়োজিত থাকিবে এই দানবাকৃতির জটিল টেলিস্কোপটি। অন্যদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও আসিতেছে নিত্যনূতন সাফল্য। মানুষের শরীরের নানা অংশ প্রতিস্থাপন, এমনকি হৃদযন্ত্র পালটাইয়া প্রাণীর হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপনেরও সংবাদ প্রকাশ পাইতেছে; কিন্তু তাহাই-বা জ্ঞানবিজ্ঞানে অগ্রগতির কতটুকু? এতকিছুর পরও মানুষ নিজেকে জানিতে পারিয়াছে কি? মানুষ যতই বাহাদুরি করুক, তাহারা নিজেকে জানিবার ক্ষেত্রে কতটা সফল হইল উহা লইয়া ভাবিতে হইবে। নিজেকে না জানিবার বা নিজের সম্পর্কে অজ্ঞ থাকিবার অর্থ হইল, জ্ঞান আহরণের প্রথম পদক্ষেপই আমরা পার করিতে পারি নাই।

আর সেই কারণেই আমাদের সকল ক্ষেত্রে অসংগতি বিদ্যমান। এই পৃথিবীতে যাহারা হাঁটিয়া বেড়াইতেছে, খাবার খাইতেছে, দাপাইয়া বেড়াইতেছে তাহারা জানে না নিজের কী করা উচিত। এই আত্মদর্শনের ক্ষেত্রে কতগুলি প্রশ্ন আমরা নিজেদেরই করিতে পারি। তাহার প্রথম প্রশ্নটি হইল, আমি কে? আত্মার মুক্তি বলিতে যে কথাটি আমরা বলিয়া থাকি তাহা কী? এই অজানাগুলি কিন্তু অধরাই রহিয়া যাইতেছে। আমরা কী দেখিতেছি? জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষের দম্ভে এক দেশ হাজার মাইল দূরের অন্য দেশের উদ্দেশে ছুড়িয়া মারিতেছে ক্ষেপণাস্ত্র। আফ্রিকার যেই দেশে একজন শিশুর একটি রুটি জোটে না, খাদ্য হিসাবে সেই শিশুর হাতে আধুনিকতম দামি একে-৪৭ রাইফেল তুলিয়া দিতেছে কাহারা? মানুষে মানুষে, দেশে দেশে সংঘাত চলিতেছে প্রাগৈতিহাসিক কালের মতোই। ইহাই কি প্রমাণ রাখে না যে, মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি এখনো সীমাবদ্ধ, অসম্পূর্ণ?

মানুষের কর্তব্য, মূল্যবোধ, নিষ্ঠা সম্পর্কে একদিকে যেমন ধর্মগুলি দিকনির্দেশনা দিয়াছে, অন্যদিকে বিশ্বের বড় বড় মনীষী পরামর্শ দিয়াছেন। সেই উপদেশগুলি, দিকনির্দেশনাগুলি বৃথা হইয়া যাইতেছে। আবার দেখা যায়, আমরা নিজেরা ঐ উপদেশ পালন না করিয়া অন্যকে পালন করিতে উপদেশ দিয়া যাইতেছি। এই সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হইয়াছে, ‘তোমরা লোকেদেরকে ন্যায়ের পথ অবলম্বন করিতে বলো; কিন্তু নিজেদের ক্ষেত্রে সেই পথ অবলম্বনের কথা ভুলিয়া যাও (সুরা বাকারা, আয়াত ৪৪)।’ মানুষের এই ছোট্ট দেহের মধ্যে কী কী রহিয়াছে, কোন বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে তাহা সম্পর্কে মানুষ উদাসীন। অথচ নিজেকে জানিবার মধ্য দিয়া সেই সকল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হইবার সুযোগ রহিয়াছে। ইসলামের পবিত্রগ্রন্থ আল কোরআনের সুরা মায়েদার ১০৫ নাম্বার আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে ইমানদারগণ, নিজেদের কথা চিন্তা করো। যদি তোমরা সত্য, সঠিক ও হেদায়েতের পথে থাকো।’

তবে ইহাও সত্য যে, নিজেকে জানিবার কাজটি কোনো সহজ বিষয় নহে। তাই ভুবনবিখ্যাত পণ্ডিত কবি জোয়ান ওল্ফগ্যাঙ ফন গোয়েথে বলিয়াছেন, ‘নিজেকে জানিবার কথা? আমি যদি নিজেকে জানিতাম, তাহা হইলে দৌড়াইয়া পালাইতাম!’ গোয়েথে যাহাই বলুন, নিজেকে জানিবার প্রচেষ্টার মধ্যেই যে জ্ঞান অন্বেষণের প্রধান উৎস রহিয়াছে, তাহা নিশ্চয়ই তিনি অস্বীকার করিতেন না!

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নজর রাখিতে হইবে চারিদিকে

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়