মোটরসাইকেল ও সড়কের শৃঙ্খলা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৬

রাইড শেয়ারিং সেবার কারণে রাজধানীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়িতেছে। এই মুহূর্তে রাইড শেয়ারিং সেবাকে অনুত্সাহিত করিবার দরকার নাই। যতদিন রাজধানীতে যানজট সহনীয় না হইতেছে, গণপরিবহনের পরিধি না বাড়িতেছে, ততদিন এই সেবার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু মোটরসাইকেল হউক আর অন্য যে কোনো যানবাহন হউক, সড়কে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নাই। আমরা মোটরসাইকেলের প্রতি বাড়তি নজর দিবার কথা বলিতেছি এই কারণে যে, সামপ্রতিককালে দেখা যাইতেছে সড়কে নিয়ম-শৃঙ্খলা না মানিবার ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলই রহিয়াছে সামনের সারিতে। যদিও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রীদের হেলমেট পরিধানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হইয়াছে, তবু অন্যান্য ট্রাফিক আইন অমান্যের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই অত্যধিক। ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত সোমবার ঢাকা শহরে ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে মোট ছয় হাজার ১৫১টি মামলা হইয়াছে। তন্মধ্যে দুই হাজার ৫১৪টি মামলাই হইয়াছে মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। শুধু তাহাই নহে, ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে যে মামলা হয়, তাহার অর্ধেকই হয় মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাহারা সুযোগ পাইলেই ফুটপাতে গাড়ি উঠাইয়া দেন, উল্টাপথ দিয়া চলাচল করেন, সিগন্যাল মানেন না ইত্যাদি। তাহাছাড়া মোটরসাইকেলের যত্রতত্র চলাচলের কারণে অনেকে বাসে ঠিকমতো উঠিতে পারেন না, তাহা হইতে নামিতে পারেন না। বিশেষ করিয়া নারী ও শিশুরা আরও বেকায়দায় পড়েন। এইক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাইতেছে। এইজন্য বাসগুলিকে যেমন নির্দিষ্ট স্টপেজ ব্যবহার করিতে হইবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, তেমনই মোটরসাইকেলগুলিও যাহাতে ফুটপাত সংলগ্ন সংকীর্ণ রাস্তা দিয়া চলাচল করিতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাহাদের জন্য নির্দিষ্ট লেন নির্ধারণ করিয়া দিতে পারিলে আরও উত্তম হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী ঢাকা শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ১৯২টি। ইহার মধ্যে শুধু মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ছয় লক্ষ ২৫ হাজার ৪১৮টি। তবে বাস্তবে ইহার চাইতেও বেশি মোটরসাইকেল চলিতেছে রাজধানীতে। কারণ রাইড শেয়ারিং সেবায় ঢাকার বাহিরে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলগুলিও যুক্ত হইতেছে। অনেকে হয়ত বলিতে পারেন, চাহিদা আছে বলিয়াই মোটরসাইকেলের সরবরাহ ও ব্যবহার বাড়িতেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে ইহার নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠায় আগাইয়া আসিতে হইবে। একসময় ঢাকা নগরীকে বলা হইত রিক্সার নগরী। রিক্সার প্রভাব এখনো আছে। তবে সেই জায়গায় মোটরসাইকেলের দাপট বাড়িতেছে। সিএনজি দিন দিন হাওয়া হইয়া যাইতেছে। এই অবস্থায় অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবার জন্য সরকার যে নীতিমালা করিয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন দরকার। দরকার অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবাসংস্থা ও মোটরসাইকেলের নিবন্ধন। তবে মোটরসাইকেল বাড়াইয়া রাজধানীর পরিবহণ সংকটের টেকসই সমাধান করা যাইবে না। রিক্সা, মোটরসাইকেল, সিএনজি, ব্যক্তিগত গাড়ি প্রভৃতির বদলে বড় বড় বাস, মেট্রোরেল, ঢাকার চারিপাশে বৃত্তাকার নৌযানভিত্তিক গণপরিবহনের উন্নতি একান্ত প্রয়োজন। যেহেতু ঢাকা একটি জনবহুল নগরী, তাই মোটরসাইকেলের সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে থাকা প্রয়োজন এবং অতিরিক্ত আয়ের জন্য যাহারা মফস্বল হইতে মোটরসাইকেল নিয়া ঢাকায় আসিতেছে, তাহাদের নিরুত্সাহিত করা আবশ্যক। এই ব্যাপারে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ যে সুপারিশ করিয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত।