আসন্ন ডাকসু নির্বাচন ও ছাত্ররাজনীতি

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৭

দীর্ঘ প্রায় আটাশ বছর পর বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ বা ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী ১১ মার্চ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন এবং ইতোমধ্যেই নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা আশা করি—অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পথও সুগম হবে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর সকল জাতীয় আন্দোলনের মূল কেন্দ্রই ছিল ডাকসু। এক সময় জাতীয় রাজনীতিতেও ছাত্ররাজনীতির যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ডাকসুসহ দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ, জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতা তৈরির কারখানা হিসেবে পরিচিত। অথচ জাতীয় রাজনীতির নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন যাবত্ দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচনের পদক্ষেপ নিয়েছেন।

আসন্ন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ দেশের মানুষের মনে নানা আশঙ্কা থাকলেও যে কোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে সকল পক্ষকেই। যেভাবেই হোক, দেশের ছাত্ররাজনীতিকে অপরাজনীতির কবল থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আর এজন্য সচেতন ছাত্রসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীর বয়স আঠারো বছরের বেশি। কাজেই কোনো আবেগ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে এবং সকল লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাদেরকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাঙালি জাতির সঠিক ইতিহাস তাদের জানতে হবে এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যতের রাজনীতি সম্পর্কে তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ছাত্ররাজনীতিতে অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে গণতান্ত্রিক আদর্শকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা হবে দেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতিবিদ। জাতীয় রাজনীতির জটিলতায় তাদের প্রবেশ করা উচিত নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য হলো ক্ষমতায় থাকা অথবা যাওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীদের রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো নিজেদেরকে দেশের ভবিষ্যত্  রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে তোলা। কাজেই জাতীয় রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ  এক হতে পারে না।

শিক্ষার্থীদের সামনে এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ রয়েছে। নিজেদেরকে যোগ্য নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে তারাই দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে।  কোনো রকম হঠকারিতা বা অপরাজনীতির প্রভাবে যেন তাদের এই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ ধ্বংস হয়ে না যায় সেদিকেও সচেতন থাকতে হবে। আমাদের দেশে রাজনীতির পাশাপাশি যে অপরাজনীতি বিরাজ করছে, তা থেকে জাতিকে মুক্ত করতেই দেশের ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন হতে হবে। সমগ্র দেশের মানুষ এই ছাত্রসমাজের দিকেই তাকিয়ে আছে। কারণ একমাত্র তারাই পারবে দেশকে অপরাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরিয়ে আনতে। জাতীয় রাজনীতির মতোই ছাত্ররাজনীতিতেও মতাদর্শগত পার্থক্য থাকবে; কিন্তু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থাত্ গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকতে পারে না। দীর্ঘদিন ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্রসংসদের নির্বাচন না হওয়ার কারণেই জাতীয় রাজনীতিতে অপরাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে প্রকৃত রাজনীতিবিদের উপস্থিতি দিন দিন কমে আসছে। দেশের ছাত্ররাজনীতি সঠিক পথে পরিচালিত হলে অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে বলে আমরা আশা করি।

ফরিদপুর