বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মাসুদ রানায় আচ্ছন্ন কয়েক প্রজন্ম

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২২, ২০:২৭

মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। হুমায়ূন আহমেদের বাইরে এদেশে পাঠকশ্রেণি সৃষ্টিতে মাসুদ রানা সিরিজের অবদান অনস্বীকার্য। কোনো পাঠক প্রথমেই মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ বা তিন বন্দ্যোপাধ্যায় অখণ্ড মনযোগ দিয়ে পড়বেন তা আশা করা যায় না। তাদের পথচলা শুরু হয় জনপ্রিয়ধারার সাহিত্যপাঠের মাধ্যমেই।

নগর ও মফস্বল তো বটেই; গ্রাম, গঞ্জেও গড়ে উঠেছিল  থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার নিজস্ব পাঠকশ্রেণি। তখন আমরা স্কুলে পড়ি। আমার এক খালাতো ভাই সিলেট শহর থেকে নিয়মিত কিনে আনতেন এই থ্রিলার সিরিজ। তার জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করতাম। তারপর কিশোর-তরুণ আমাদের হাতে হাতে ঘুরতো বইগুলো। অ্যাডভেঞ্চার ও কল্পনাপ্রবণ সবুজ মন, নিউজপ্রিন্ট সংস্করণের জন্য দামে সস্তা— সিরিজটির তুমুল জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। প্রতিবছরই বইমেলায় সেবা প্রকাশনীর সামনে তরুণ-তরুণীদের ভিড় মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের পিতা ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, দাবাড়ু ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, পিতার সুবাদে শৈশবেই সান্নিধ্য পেয়েছেন খ্যাতিমান সব বাঙালির। বেড়ে উঠেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুকূল পরিবেশে।

ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন চিরায়ত বই বাংলায় অনুবাদ করে পেপারব্যাক সংস্করণে স্বল্পমূল্যে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়ার কাজটি তিনিই শুরু করেছিলেন। এদেশে বিশ্বসাহিত্যের অনেক শ্রেষ্ঠ বই ও লেখকের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর উদ্যোগেই। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে ‘বিদ্যুৎ মিত্র’ ও ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ নাম ব্যবহার করতেন। রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে বইগুলো নিয়ে সমালোচনাও ছিল। বিশেষ করে বেশ কিছু বইয়ের রগরগে প্রচ্ছদের জন্য। মাসুদ রানা সিরিজে তিনি ‘যৌনতার বেসাতি’ পেতেছেন বলেও অভিযোগ ছিল।

বাঙালির সৃষ্টিশীল ষাটের দশকে ‘ধ্বংস পাহাড়’ দিয়ে মাসুদ রানা সিরিজের যাত্রা শুরু হয়। আনোয়ার হোসেনের বন্ধু সাংবাদিক রাহাত খান মাসুদ রানা সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ কল্পিত একটি চরিত্র। কিন্তু সিরিজটির লেখক তিনি একা নন। তাঁর একান্ত দু একজন স্বজন ছাড়াও বিচিত্রার শাহাদাত চৌধুরী, সুলতান মাহমুদ, সিলেটের একজন চিকিৎসকও (হীরক চৌধুরী বা আবদুল হাই মিনার) এ তালিকায় আছেন। তাদের মধ্যে শেখ আবদুল হাকিম প্রধান। আনোয়ার হোসেন তাদের ‘গোস্ট রাইটার’ বলতেন। গোস্ট রাইটার ধারণা নতুন নয়। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লেখকের জীবনী লিখেছেন গোস্ট রাইটাররা। কিন্তু সম্প্রতি আবদুল হাকিম কপিরাইট অফিসে স্বত্ত্ব দাবি করে অভিযোগ করেন। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে রায় দিয়েছেন। হাইকোর্টের এক আদেশে বলা হয়েছে, মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি ও কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখকস্বত্ত্ব বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিমের।

হিন্দু সম্প্রদায়ের চেয়ে বাঙালি মুসলমানদের দেশভাগের বেদনা খুব কম সইতে হয়েছে। সেই দুর্ভাগাদের একজন আবদুল হাকিম। পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে জন্ম নেওয়া আবদুল হাকিম শৈশবেই দেশভাগের দুঃখ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে জন্মভূমি ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন। গত বছর আগস্টে ঢাকার নন্দীপাড়ায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর গতকাল বিদায় নিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। এক সময় অন্তরঙ্গ হলেও সিরিজের স্বত্ত্বকে কেন্দ্র করে দুজনের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক কালে মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে বিবিধ বিতর্ক উপেক্ষা করে উদ্যোক্তা, অনুবাদক, প্রকাশক ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজী আনোয়ার হোসেনের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা যায়। তিনি তাঁর সৃজনশীল উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কয়েক প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন।

লেখক: কবি ও গবেষক

 

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ব্রিটেনের রানির পুরস্কার পেলেন বিদ্যানন্দের কিশোর

মেডিকেলে ৫০তম ইভা, ডেন্টালেও প্রথম

নাদিয়ার সাহসী উদ্যোগ

বাকৃবিতে ‘আলোকসরণির’ ভিন্নধর্মী কার্যক্রম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হাত রাঙানোই নুসরাতের স্বপ্নের পেশা

সেই সব বইপ্রেমীদের গল্প

ককপিটের গল্প শোনান ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ

দ্রুততম বীজ-অঙ্কুরোদগম পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন দুই কলেজছাত্র