বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:১৮

বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি বিরাট অবদান রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুতরাং, কোনো দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়া এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২০১৯ ও ২০২০ সালে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় ২৪ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা এবং ২২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ২০২১ সালে দেশে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল (পিপিপি) প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। ২০২০ সালে গণচীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১২,০৭,২৬০; ৪,৩২,৬৩০; ২,০৪,৩৪৫ ও ১,৩৭,৬৫৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্বের বিষয়টি অনুধাবনের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম প্রসঙ্গে আলোকপাত করা যাক। একসময় এই তিন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগের ফলে দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অতি দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।

প্রথমে মালয়েশিয়া প্রসঙ্গে আলোকপাত করা যাক। ১৯৮০ সালে মালয়েশিয়ার বাত্সরিক মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। ১৯৯০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ২০০০ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ২০১০ ও ২০২০ সালে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় ১৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং প্রায় ২৫ লাখ ৯ হাজার টাকা। জাপান, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান মালয়েশিয়ায় প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। মালয়েশিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২০ সালে জিডিপি ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। ১৯৮০, ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে প্রায় ১ হাজার৫০০ কোটি, ৩৬ হাজার ৭০ কোটি এবং ৩৮ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে শুধু জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৬১৫ ও প্রায় ৯ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলে ছিল ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ায় প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় মালয়েশিয়ার ইলেকট্রকিকস শিল্পের মোট বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের বেশি ছিল বৈদেশিক বিনিয়োগ। মালয়েশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ হলো ইলেকট্রনিকস সামগ্রী। ২০২০ সালে মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। ১৯৮০ সালে জাপানের বিনিয়োগের ফলে মালয়েশিয়ার শিল্প খাত বিকাশ লাভ করে এবং দেশটির লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে আত্মনির্ভরশীল শিল্পোন্নত দেশ হওয়া। মালয়েশিয়ায় ‘প্রোটন’ ও ‘পেরোডুয়া’ নামক গাড়ি উৎপাদিত হচ্ছে এবং এই শিল্পে প্রায় ৭ লাখ লোক কর্মরত রয়েছেন। দেশীয় ও বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে। ১৯৯৬ সালে শুধু ইলেকট্রনিকস শিল্পে মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালে মালয়েশিয়ার মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা এবং এর প্রায় ৩৭ শতাংশ ছিল ইলেট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস দ্রব্য বিক্রয়ের মাধ্যমে। দক্ষ জনবল, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা, তুলনামূলক স্বল্প মজুরি ব্যয়, উন্নত জীবনযাত্রার মান, ডিজিটাল সংযোগব্যবস্থা, সরকারের বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি ইত্যাদি মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়নে সহায়তা করেছে।

থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এখানে তার পরিসংখ্যান আর দিতে চাই না। তবে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো যদি বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, তবে নিঃসন্দেহে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আরো উন্নতি ঘটবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য দেশের ভাবমূর্তি একটি বড় বিষয়। সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ এবং সংযোগ (কানেক্টিভিটি) ঘটানো ও রক্ষার ক্ষমতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্যতা, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ইত্যাদি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীগণের কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে নোংরা পরিবেশ, অব্যবস্থাপনা, জনগণের অসংযত আচরণ ও ব্যবহার ইত্যাদি কোনো দেশের প্রতি নেতিবাচক ইমপ্রেশন তৈরি করে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অবকাঠামোগত সুবিধা, উন্নত টেলিযোগাযোগব্যবস্থা, সহায়ক শিল্পের বিকাশ, দক্ষ ও প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, বাজারসুবিধা ইত্যাদি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীগণকে আকৃষ্ট করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা প্রয়োজন। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি বাংলাদেশে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস এবং অটোমোবাইল শিল্পে বিনিয়োগ করানো যায়, তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়ন।

লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমের আঁটি বর্জ্য নয়, সম্পদ

আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর হয়ে এসেছিলেন তিনি

উলটা বুঝিলি রে!

বর্তমান সংস্করণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অনিরাপদ!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ইউক্রেন যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ শেষ পরিণতি

যে কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে

রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে এখনো কি কূটনৈতিক তৎপরতা সম্ভব?

অসুখ-বিসুখ