বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৬

যে কোনো ক্ষেত্রে, যে কোনো খাতে যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহা লইয়া আর ঝক্কিঝামেলা পোহাইতে হয় না। ইহা সড়কের ক্ষেত্রে আরো বড় সত্যি। দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নির্মম মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে। বিশ্বাস করিতে কষ্ট হয় যে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন বা নিহত হন। ইহা কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করিতে পারে না; ইহা অনেক যুদ্ধরত দেশের মৃত্যুর গড়কেও হার মানায়। এতৎসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ লইয়া নানা বিশেষজ্ঞ নানা কথা বলেন। কখনো চালককে দায়ী করা হয়, কখনো সড়কের বেহাল অবস্থাকে দায়ী করা হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে সড়কে চলাচলকারীর অসচেতনতার কথা বলা হইয়া থাকে। কিন্তু বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, এই সড়ক দুর্ঘটনার পিছনের কারণ অনেক গভীরে প্রোথিত। আর তাহা হইল সার্বিক শৃঙ্খলার অভাব, যাহা একক কোনো ব্যক্তির উপর বর্তায় না। শৃঙ্খলার একটি বড় জায়গা হইল সড়ক প্রকৌশল। আমরা বরাবরই দেখিয়া আসিতেছি, একটি সড়ক যখন করা হয়, তখন সার্বিক পরিকল্পনায় ঘাটতি রহিয়া যায়। গাড়ি কোথা দিয়া চলিবে, মানুষ কোথা দিয়া হাঁটিবে, কোথায় সাইন-সিগন্যাল থাকিবে তাহা সুপরিকল্পিতভাবে করিবার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকিয়া যায়। এমন ঘটনাও বিরল নহে যে নির্মাণকাজ অর্ধেকের অধিক হইয়া যাইবার পর পরিষ্কার হইয়া উঠিল যে প্ল্যানিংয়ে ভুল ছিল, তখন আবার ভাঙিয়া গোড়া হইতে শুরু করিতে হয়। তাহার পর নির্মাণকাজ হইতে শুরু করিয়া সড়কে চলাচলের সর্বক্ষেত্রে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। অথচ আমরা যাহাদের নিকট হইতে সাহাঘ্য বা পরামর্শ লইয়া এই সকল উন্নয়নের কাজ করি, তাহারা কিন্তু সর্বাগ্রে চায় শৃঙ্খলা, যাহা অনুপস্থিত থাকে। আমাদের যে সামর্থ্য আছে, যতটুকু অবকাঠামো আছে তাহাতেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমাইয়া আনা সম্ভব হইত, যদি সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাইত। এক দিকে কোথায়ও ট্রাফিক সাইন নাই, আবার অন্য দিকে ট্রাফিক সাইন থাকিলেও কেহ মানিতেছে না। ইহাকেই ইংরাজিতে বলা হয় টোটাল ক্যাওস। এখন রাস্তায় রাস্তায় আমরা কর্তব্যরত সার্জেন্ট দেখিতে পাই, যাহাদের প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয় হইতে পাশ করিয়া চাকুরি লইয়াছেন এবং ডিউটিতে নামিয়াছেন। তাহাদের সঙ্গে থাকে কয়েক জন করিয়া ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। অথচ তাহাদের সম্মুখেই বিশৃঙ্খলভাবে যান চলাচল করিতে দেখা যায়।

দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫০ বৎসর। আর কত? এখনো যদি সার্বিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহা হইলে হতাশই হইতে হয়। এই দেশে ইতিমধ্যে গড়িয়া উঠিয়াছে নানা ধরনের শক্তিশালী বাহিনী। সেই সকল বাহিনীকে যদি অন্যত্র নিয়োজিত না করিয়া শুধু সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইতে নিয়োজিত করা হয়, তাহা হইলে প্রতিদিন ৬৪ জন মানুষের একটি বড় অংশকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করা সম্ভব হইত। সেই সঙ্গে ইহাও মনে রাখা দরকার যে যতক্ষণ পর্যন্ত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনোভাবেই, কোনো পরিকল্পনার মধ্য দিয়াই এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার যন্ত্রণা হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে না। কেবল সড়কেই নহে, সর্বক্ষেত্রেই শৃঙ্খলাই পারে সফলতা ছিনাইয়া আনিতে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বলিয়াছিলেন, শৃঙ্খলা ও সংহতিই হইল জাতির শক্তির প্রকৃত উৎস। ইহা বুঝিতে পারিলেই সকল সমস্যার সমাধান হইতে পারে। তাই আমাদের পরামর্শ থাকিবে, সড়ক অবকাঠামো যাহা নূতন করিয়া গড়িয়া উঠিতেছে, তাহা হইতে থাকুক। কিন্তু ইতিমধ্যেই জালের মতো যে অসংখ্য সড়ক গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাতে যে কোনো মূল্যে শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা করা প্রধান কর্তব্য হইয়া উঠিয়াছে। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নজর রাখিতে হইবে চারিদিকে

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়