বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অস্পষ্টতা গুজব সৃষ্টির সহায়ক

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:০৩

প্রবাদ রহিয়াছে—কথায় জয়, কথায় ক্ষয়। ইহা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি যথাযথ প্রবাদ বলিতে হইবে। ঘর আছে খুঁটি নাই, ছাদ আছে দেওয়াল নাই—এমন পরিস্থিতির দেশগুলিতে দেখা যায় সকলেই কথা বলেন। কথা বলিতে যেহেতু ভ্যাট-ট্যাক্স লাগে না, তাই কথা কেহ ছাড়িতে চাহেন না। জানুক আর না জানুক, কোনো বিষয় বুঝুক আর না-ই বুঝুক—দেশ, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, প্রশাসন এমনকি আন্তর্জাতিক বিষয় লইয়াও কথার ফুলঝুরি ফুটাইয়া থাকেন। যাহারা বলেন এবং লিখিয়া থাকেন তাহাদের সম্যক জ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থাকিয়া যায় বইকি। আর এই অধিক কথন গুজব সৃষ্টিতেও বিশেষ অবদান রাখিতেছে। তবে মানিতে হইবে, গুজবের বড় কারণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসঙ্গতিপূর্ণ কাজ ও সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত। এই বিষয়ে একটি উদাহরণই যথেষ্ট হইবে। বর্তমানে রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী মাঠ প্রশাসনে পুলিশের এসপি জেলা প্রশাসকের অধীনে নহেন; কিন্তু জেলার মাঠ প্রশাসন পরিচালিত হয় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে।

আবার পদাধিকার বলে জেলা আইনশৃঙ্খলা রিভিউ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসকের এই কমিটির বৈঠকে পুলিশের নূন্যতম এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে; কিন্তু বহুকাল ধরিয়াই জেলা প্রশাসকরা অভিযোগ করিয়া আসিতেছেন যে, ঐ বৈঠকে এসপিরা উপস্থিত থাকেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমনকি সহকারী পুলিশ সুপারকেও প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করা হয়। ইহা লইয়াও অনেক গুজব শুনিতে পাওয়া যায়। এতত্সংক্রান্ত বিষয়ে প্রজ্ঞাপন, পরিপত্রে অস্পষ্টতা থাকায় নানা জটিল পরিস্থিতি সৃষ্ট হইতেছে। কিছু কিছু জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাজে সমন্বয় ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থান থাকিলেও অনেক জেলায় যে ইগো-সংঘাত চলিতেছে তাহা লইয়াও জনমনে সৃষ্টি হইতেছে গুজব। বাংলাদেশে ভূমি লইয়া সর্বাধিক সমস্যা দেখা যায়। কৃষি অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বাস্তবায়ন জেলা প্রশাসন করিয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। জমি দেওয়ানি মামলাসহ খুনখারাবি এবং ফৌজদারি মামলা হইয়া থাকে। সেই ক্ষেত্রে পুলিশের রহিয়াছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সুতরাং যাহারা সিদ্ধান্ত নেন তাহারা যদি সবকিছু সুস্পষ্ট না করিয়া দেন তাহা হইলে জনমনে নানা ধরনের গুজবই স্থান করিয়া লইবে, ইহাই স্বাভাবিক।

ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না, গুজব উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়ও। গুজবের উপর ভিত্তি করিয়া যখন একটি সরকারকে বিদায় লইতে হয়, অথবা সরাইয়া দেওয়া হয় তখন উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইয়া থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সরকারের প্রধান নির্বাহী নির্বাচিত হইয়া থাকেন চার বৎসরের জন্য, আর উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সরকার পাঁচ বৎসর মেয়াদে কাজের সুযোগ পায়। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন, উন্নয়নশীল দেশে সরকার পরিচালনার মেয়াদ নূন্যতম ১০ বৎসর হওয়া উচিত। তাহাতে উন্নয়নকাজ ব্যাহত হইবার সম্ভাবনা কম থাকে। দেখা যায়, একজন নির্বাহী যখন সরিয়া যান অথবা ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, তখন শোনা যায় তিনি যতগুলি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করিয়া গিয়াছেন তাহা দিয়া কয়েকটি তাজমহল গড়িয়া তোলা যায়!

সুতরাং গুজবই উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়ন, গুজবই উন্নয়নশীল বিশ্বের পতন। গুজব সৃষ্টি হইবে তাহা দায়িত্বশীলদের মনে রাখিয়া সকল বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হইবে। গুজব রাজনীতিরও অংশ। বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে গুজব ছড়াইবার সুযোগও যেমন বৃদ্ধি পাইয়াছে, তেমনি গুজবের সংখ্যাও বাড়িয়াছে। আমরা আশা করিব, রুলস অব বিজনেসসহ যেই সকল ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় ঘাটতি রহিয়াছে তাহা প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের লইয়া নীতিনির্ধারক মহল স্পষ্ট করিয়া তুলিবেন। তাহাতে গুজব ছড়াইবারও সুযোগ কমিয়া আসিবে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়

সামনের দিনগুলি অনিশ্চয়তার