শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে ‘সাকু‌র্লার ইকোনমি’র বিকাশ জরুরি

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ১০:০২

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহার বাড়ছে। পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু, বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। শঙ্কা তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বর্জ্য ও দূষণ রোধ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাকু‌র্লার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে কার্বন নিঃসারণ কমে, দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায় পরিবেশ। বৃত্তাকার অর্থনৈতিক মডেলে উৎপাদন ও ভোগের মধ্য সমন্বয় সাধন হয়। পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে কার্বন নিঃসারণ কমে, দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায় পরিবেশ। তাই টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে সাকুর্লার ইকোনমি। বিশ্বে এখন কেউ বর্জ্যকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে না। এক শিল্পের বর্জ্য অন্য শিল্পের জন্য উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন, ২০৩১ সাল নাগাদ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হবার লক্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশের। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর সেজন্য সাকু‌র্লার ইকোনমির বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। যে হারে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার হচ্ছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে মূল্যবান বিভিন্ন খনিজের মজুত শেষ হয়ে যাবে। তবে পুনঃ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। ঐ বিবেচনা থেকেই এখন বৃত্তাকার অর্থনীতির দিকে এগোনো দরকার।

দেশে নির্মাণশিল্প, টেক্সটাইল, মোটরগাড়ি, লজিস্টিকস, কৃষি, আসবাব, তেল ও গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সাকু‌র্লার ইকোনমিতে অন্তভু‌র্ক্ত করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার মাত্র সাত থেকে আট কেজি। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে প্লাস্টিক-বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে এর পরিমাণ ১৩০ কেজি। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যকে পুনরায় সম্পদে রূপান্তর করছে দেশটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সাকু‌র্লার ইকোনমি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। ইউরোপীয় কমিশন এরই মধ্যে সাকু‌র্লার ইকোনমি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। এছাড়াও চীন, ব্রাজিল, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান তাদের অর্থনীতিকে সাকু‌র্লার ইকোনমিতে রূপান্তরের জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশেরও একই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সেজন্য উৎসে বর্জ্যকে ধরন অনুযায়ী আলাদা করে সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে আলাদা কোনো ডাম্পিং জোন নেই যেখানে বর্জ্যকে আলাদা করা সম্ভব। এজন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। সাকু‌র্লার ইকোনমি নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রণালয়ে একটি আলাদা সেল গঠন করতে হবে। এই সেল সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংগঠনের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে। সাকু‌র্লার ইকোনমি বিকাশের জন্য অপরিহার্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। দেশে অনানুষ্ঠানিক ভাবে এ বিষয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। এই খাতের আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পের মর্যাদা পাওয়া উচিত। এ বিষয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। বর্তমানে ৪০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। বাকি ৬০ শতাংশকেও এর আওতায় আনতে হবে। এজন্য প্লাস্টিক ব্যবস্হাপনা বিষয়ে ওয়ার্কিং পেপার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। যে হারে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার হচ্ছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে মূল্যবান বিভিন্ন খনিজের মজুত শেষ হয়ে যাবে। তবে পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। বাংলাদেশের বৃত্তাকার অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা আছে। দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃ প্রক্রিয়াজাত হয়। এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা বাড়ছে। এই খাতকে শিল্প হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে দেশের সাকু‌র্লার ইকোনমির বিকাশ আরো গতিশীল হবে।

গত ১০ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি খুবই প্রশংসনীয়। শিল্পায়ননির্ভর অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিগত চার দশকে একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পেছনে আমাদের যে যাত্রা তার মূলে রয়েছে শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ, কিন্তু পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধির দিকে যাব কি না, এখন তা নির্ধারণ করার সময় এসেছে। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে প্রতিবছর সুতা ও কাপড় ডাইং ও ওয়াশিংয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি লিটার পানি খরচ হয়। পরিবেশের ওপর শিল্পের আরেকটি ক্ষতিকর প্রভাব হলো কারখানার ব্যবহূত পানি নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ে প্রবাহিত হয়ে যায়। পোশাক কারখানার এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ও রং মিশ্রিত পানি নদ-নদী, খাল-বিলের পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। যার ফলে নদ-নদী, খাল-বিলের মাছ মারা যাচ্ছে, চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটছে। এতে কৃষি উৎপাদনে প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। এসব কারখানার প্রায় সবগুলোই ভূগর্ভস্হ উৎসের পানি ব্যবহার করে। এসব কারখানা যদি আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে পানির ব্যবহার চারভাগের এক ভাগও সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়, তবে তাতে করে কেমিক্যালের ব্যবহারের মাত্রা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে যত বেশি পানি থাকে, তা ফুটাতে তাপ প্রয়োগের জন্য বেশি পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। তাই পানির ব্যবহার কমাতে পারলে মহামূল্যবান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসেরও সাশ্রয় হবে।

পরিবেশবান্ধব স্হাপনার বিভিন্ন নির্ণায়কের মধ্যে রয়েছে টেকসই নির্মাণ ভূমি, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, নিরাপত্তা, পানি ব্যবহারের দক্ষতা, কর্মবান্ধব পরিবেশ, অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত মান, কারখানার অভ্যন্তরে বায়ুর মান, প্রযুক্তির ব্যবহার, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্হা, দুর্ঘটনা মোকাবিলার সক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্হাপনা ইত্যাদি। একটি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানায় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে পানি, বিদু্যত্, রং এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশবান্ধব উপায়ে হচ্ছে কি না তা দেখা হয়। অধিকাংশ পোশাকশিল্প কারখানা ইটিপি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গতানুগতিক ইটিপির পরিবর্তে বায়োলজিক্যাল ইটিপি ব্যবহার করছে, যা আমাদের সবুজ বিপ্লবেরই একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে টেকসই উন্নয়নের বিকল্প নেই। তাই বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্হান আরো সুদৃঢ় করে তুলতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্হায় মনোযোগী হতে হবে।

বাংলাদেশের শিল্পকারখানার মালিকরা এখন এসব বিষয়ে খুব সচেতন হচ্ছেন। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহী হয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এরই মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান পানি ও গ্যাস সাশ্রয়ে ইতিবাচক ব্যবস্হা নিয়েছেন। পানি রি-সাইক্লিনিংয়ের ব্যবস্হা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার ফলে শতকরা ২৪ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ পানির অপচয়ও কমে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জাহাজ নির্মাণশিল্পে স্বল্প সুদে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল

রেমিট্যান্সে প্রণোদনা ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব

দেশে প্রথম বার ব্রোকারেজ ব্যবসায় আসছে শ্রীলঙ্কান কোম্পানি

দুই শতাধিক বিলাসবহুল ও বিদেশি পণ্যে শুল্ক আরোপ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলো ৪০ পয়সা

১৯ দিনেই ১৩১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন চ্যালেঞ্জে দেশের অর্থনীতি 

টানা ৯ মাস বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হার