বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক হওয়া উচিত

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:৪৩

একটি দেশে যাহারা সরকার গঠন করেন ও পরিচালনা করেন, তাহারা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। বিরোধী দলও প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। কারণ তাহারা ক্ষমতায় গেলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ থাকে। অনুরূপভাবে স্থানীয় পর্যায়ে একজন এমপি তাহার সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন; কিন্তু একজন ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারও যখন কথায় কথায় জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেন, তখন ইহার চাইতে পরিহাসের কথা আর কিই-বা হইতে পারে! এমন প্রতিশ্রুতির কথাও বলা হয়, যাহার বাস্তবায়ন তাহার ক্ষমতার বাহিরে। তাহা হইলে তিনি বা তাহারা এমন প্রতিশ্রুতি দেন কেন? স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় এমন রাস্তাঘাট তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন, যাহার কোনো নম্বর নাই। অর্থাত্ ইহা একটি অপ্রচলিত রাস্তা। ব্রিজ-কালভার্ট তৈরির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহার অর্থ, প্রতিশ্রুতি দিলেও তাহা যথাযথ হইতে হইবে।

আর সক্ষমতা থাকিলেও যত্রতত্র প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঠিক নহে। সেই ক্ষেত্রে বরং চুপ থাকাই বাঞ্ছনীয়। একশ্রেণির রাজনীতিক রহিয়াছেন, যাহারা কেবল প্রতিশ্রুতিই দিয়া যান; বাস্তবে দেখা যায়, কাজের সহিত কথার কোনো মিল নাই। ইহা জনগণের সহিত একধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নহে। তবে বাংলাদেশে এমন রাজনীতিকও রহিয়াছেন, যিনি বা যাহারা প্রতিশ্রুতিই দেন না বা দিলেও কদাচিত্ দেন; কিন্তু প্রতিশ্রুতি না দিয়াও তাহারা নীরবে-নিভৃতে জনগণের জন্য কাজ করিয়া যান। অর্থাত্ জনকল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করিবার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি না দিলেও চলে। এমনও জনদরদি নেতা রহিয়াছেন, যিনি দেশের প্রধান নির্বাহীর সহায়তায় শত শত ব্রিজ-কালভার্ট ও রাস্তা তৈরি করিয়াছেন; কিন্তু সেই কাজ করিবার পূর্বে কোনো প্রতিশ্রুতি দেন নাই। তাহার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেন নাই। কেবল সাধারণ মানুষের চাহিদার কথা মনোযোগসহকারে শুনিয়া গিয়াছেন। ইহার পর কাজেকর্মে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রমাণ রাখিয়াছেন। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডই তখন তাহার নীরব প্রতিশ্রুতির সাক্ষী ও প্রতীক হইয়া যায়। আসলে ইহাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাহা উপলব্ধি না করিতে পারিয়া মিথ্যা প্রতিশ্রুতির পিছনে ছুটিয়া চলেন।

প্রতিশ্রুতির বিষয়টি শুধু রাজনীতিক নহে, প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পারিবারিক, সামাজিকসহ সকল ক্ষেত্রেই এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নহে, যাহা পালন করা কঠিন। প্রত্যেককেই তাহার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হইতে হইবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা বলিতে পারি, নির্বাচনের পূর্বে প্রত্যেক দল ক্ষমতায় আসিয়া কী করিবে তাহার একটি ইশতেহার ঘোষণা করে। এই নির্বাচনি ইশতেহারও একধরনের প্রতিশ্রুতি। এই প্রতিশ্রুতিও হওয়া উচিত পরিকল্পনামাফিক ও বাস্তবসম্মত। যাহারা জোট গঠন করিয়া নির্বাচন করেন, তাহাদের প্রত্যেকের প্রতিশ্রুতি প্রদানের দরকার নাই। জোটের পক্ষ হইতে একক নির্বাচনি ইশতেহার দিলেই চলে। নাগরিকদের সচেতনতার স্তর উন্নত হইলে একদিন মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির পথ বন্ধ হইয়া যাইবে বলিয়া আশা করা যায়।

২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর স্পষ্টভাবে বলিয়াছিলেন যে, নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ না হইলে তাহার জন্য অবশ্যই দায়ী রাজনৈতিক দলগুলি। তাহার মতে, ‘জিতে আসলে সেই সব প্রতিশ্রুতি পূরণেরও আশ্বাস দেওয়া হয়; কিন্তু বাস্তব চিত্রটা থাকে আলাদা।’ ইহা নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থি এবং কপটতার শামিল। সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরেই প্রতিশ্রুতি পালন করা অবশ্য কর্তব্য। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করিলে সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পায়। অতএব, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক হইতে হইবে এবং আমাদের প্রতিশ্রুতি হইতে হইবে সুনির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নজর রাখিতে হইবে চারিদিকে

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়