বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দরিদ্র ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রসঙ্গে 

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৩:১৮

প্রতি বছরই আমাদের রাষ্ট্রীয় বাজেট এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাড়ছে না। বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে কর্মসংস্থান এমনিতেই বাড়েনি, তার ওপর করোনার প্রথম, দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ তৃতীয় ঢেউয়ের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লোক ছাঁটাই হয়েছে। সেইসঙ্গে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা দেশে ফেরায় বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনায় লকডাউনের কারণে দিনমজুরেরা বিশেষ করে দৈনিক ভিত্তিতে খেটে খাওয়া মানুষ কাজ হারিয়ে আর্থিক সংকটে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। করোনার প্রভাবে এক বছরে নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। সারা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ কর্মী কাজ হারিয়েছেন, যারা এখনো কাজে ফিরতে পারেননি। দেশে বর্তমানে দারিদ্রে্যর হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। আমাদের দুর্ভাগ্য, ২০২০ সালের প্রথম দিক থেকেই কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে দেখা দেওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব না হলেও অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাবে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাৎ, করোনার কারণে নতুন করে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সুষ্ঠু বণ্টন করা হয়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার মাত্র ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। অথচ স্বল্প পঁুজিতে এ খাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সব থেকে বেশি।

সম্প্রতি দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. অবুল বারকাতের এক গবেষণায় জানা যায়, দেশে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার মানুষ কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। শুধু লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়েছেন ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন। অর্থর্াত্, মোট কর্মক্ষম মানুষের ৫৯ শতাংশই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকার হয়েছেন সেবা খাতে। করোনা পরিস্হিতির কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

বর্তমান পরিস্হিতি কাটিয়ে উঠতে এসব সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আগামী বাজেটে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। বেকারদের কর্মে নিয়োগ করে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে উত্পাদন প্রক্রিয়া সচল থাকবে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণের দ্রুত ব্যবস্থা করা। শুধু অর্থ বরাদ্দ রাখলেই হবে না, বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন হয়, সেদিকে কড়া নজরদারি ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ না পেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান ও উত্পাদন বৃদ্ধি না পেলে চলমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হবে।

এবার আসি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কথায়। দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। বিরাটসংখ্যক এই জনগোষ্ঠীর কথা কেউ তেমন করে ভাবে না। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির প্রবীণ জনগোষ্ঠী এই করোনার সময়ে সব থেকে বেশি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরা পরিবার বা সমাজে একবারেই অপাঙ্ক্তেয়। করোনার অভিঘাতে এই জনগোষ্ঠী সর্বাধিক জর্জরিত। করোনায় প্রবীণ ব্যক্তিরাই আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি। যথাযথ চিকিত্সা ও সেবার অভাবে প্রবীণের মৃতু্যহার বেড়েই চলেছে। এবারের বাজেটে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সার্বজনীন স্বাস্হ্যসেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। প্রবীণেরা যাতে পরিবার ও সমাজে নির্বিঘ্নে ও সম্মানজনক অবস্থায় বাঁচতে ও চলাফেরা করতে পারেন, সেজন্য স্বাস্হ্য খাতে আলাদা বরাদ্দসহ হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত আসন, রেলওয়েসহ গণপরিবহনে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকিট সরবরাহ ও আসন নির্ধারিত থাকতে হবে। এর পাশাপাশি, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সঞ্চয় বু্যরোর দপ্তরসমূহ, অফিস-আদালত, রেলওয়েসহ সর্বক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আসন নির্ধারণসহ পৃথিবীর অন্যান্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও সুব্যবস্থা থাকতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এই দাবিগুলো করে এলেও এর কোনো বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমরা দেখছি না। দেশ ও সমাজের জন্য যারা একসময় বিরাট অবদান রেখেছেন, তাদের সমস্যাসমূহ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

আমাদের দেশে শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা এমনিতেই কম। করোনার সময়ে নারীরা আরো বেশি কর্মহীন হয়ে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। জানা যায়, করোনা-পূর্ববর্তী কর্মজীবী নারীর এক-তৃতীয়াংশ গত বছরের জুন থেকে এখন পর্যন্ত বেকার অবস্থায় রয়েছেন। এসব কর্মহীন বেকার নারী যাতে করে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে ঘরে বসেই কুটির শিল্পসামগ্রী তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি বা ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, আমাদের দেশে একটা বিরাট সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী জনগোষ্ঠী অবসরগ্রহণের পর তাদের আর কিছুই করার থাকে না। নিজের ও পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা সারা জীবনের আয়ের একটি অংশ দ্বারা সঞ্চয়পত্র ক্রয় করে থাকেন। অবশ্য যারা সত্ভাবে জীবন নির্বাহ করেন, এটাই অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের আর্থিক সক্ষমতার উত্স। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রবীণদের সঞ্চয়ের এই মুনাফা বিগত দুই অর্থবছর ধরে ৫ শতাংশ হারে কেটে রাখা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অমানবিক। এছাড়া মাত্র ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকার একবারও কি ভেবে দেখেছে, ৫০ লাখ টাকার মুনাফা কত আসে? দুর্মূল্যের বাজারে এই অর্থ দিয়ে একটি সংসার চালানো কীভাবে সম্ভব? এ নিয়ে বহু আবেদন-নিবেদন, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য যারা একসময় তাদের তারুণ্যকে বিকিয়ে দিয়েছেন, শ্রম দিয়েছেন, তাদের সুবিধা-অসুবিধা কেউ ভাবছেন না। এ বছরের বাজেটে উল্লিখিত দিকসমূহ বিশেষভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমের আঁটি বর্জ্য নয়, সম্পদ

আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর হয়ে এসেছিলেন তিনি

উলটা বুঝিলি রে!

বর্তমান সংস্করণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অনিরাপদ!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ইউক্রেন যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ শেষ পরিণতি

যে কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে

রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে এখনো কি কূটনৈতিক তৎপরতা সম্ভব?

অসুখ-বিসুখ