বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সড়কে বিশৃঙ্খলা আর কত দিন?

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৫:৩২

পত্র-পত্রিকা কিংবা টিভি চ্যানেলগুলির সংবাদে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার কিছু না কিছু খবর দেখা যাইবেই। বিশ্বাস করিতে কষ্ট হয় যে, সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেন। ইহা যেন এক মহামারিরূপে আবির্ভূত হইয়াছে। অন্য বিশেষ কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনায় দিনে যদি ৬০ হইতে ৭০ জন মৃত্যুবরণ করিত, তাহা হইলে দেশে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জারি করিবার উপক্রম হইত। ইহা কোনো সভ্য দেশ কল্পনাও করিতে পারে না; ইহা অনেক যুদ্ধরত দেশের মৃত্যুর গড়কেও হার মানায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, করোনা নিয়ন্ত্রণে ৮৫ দিন পরিবহন বন্ধ থাকিবার পরও বিদায়ি ২০২১ সালে ৫ হাজার ৬২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছে ৭ হাজার ৮০৯ জন; এই সকল দুর্ঘটনায় আহত হইয়াছে ৯ হাজার ৩৯ জন। দিনদিন যেইভাবে সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত হইতেছে, দুর্ঘটনায় আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীর সংখ্যা বাড়িতেছে, তাহাতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতার বিষয়টি আর দায়িত্বশীলদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হইতেছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের কারণ লইয়া নানা বিশেষজ্ঞ নানান কথা বলেন। ইহার মধ্যে রহিয়াছে চালকের অসতর্কতা, জনসাধারণের অসচেতনতা, বেপরোয়া কিংবা অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিং, ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ইত্যাদি; কিন্তু বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, এই সড়ক দুর্ঘটনার পিছনের কারণ অনেক গভীরে গ্রোথিত। আর তাহা হইল সার্বিক শৃঙ্খলার অভাব, যাহা একক কোনো ব্যক্তির উপর বর্তায় না। দেখা যাইতেছে, সড়কের কোথাও কোথাও ট্রাফিক সাইন-সিগন্যাল নাই, অন্যদিকে ট্রাফিক সাইন থাকিলেও কেহ মানিতেছে না। সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচলও সৃষ্টি করিতেছে বিশৃঙ্খলা। জীর্ণশীর্ণ, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহনগুলি একদিকে ট্রাফিক আইন, সাইন-সিগন্যাল ভঙ্গ করিয়া যত্রতত্র গাড়ি থামাইয়া যাত্রী উঠানামা করাইতেছে, অন্যদিকে তাহারা অন্য গণপরিবহনগুলির সহিত লিপ্ত হইতেছে অসুস্হ প্রতিযোগিতায়। ইহাতে দুর্ঘটনার কবলে পড়িয়া হতাহত হইতেছে সাধারণ মানুষ। বিশৃঙ্খলার একটি বড় জায়গা হইল সড়ক প্রকৌশল। আমরা বরাবরই দেখিয়া আসিতেছি, একটি সড়ক যখন করা হয়, তখন সার্বিক পরিকল্পনায় ঘাটতি রহিয়া যায়। গাড়ি কোথা দিয়া চলিবে, মানুষ কোথা দিয়া হাঁটিবে, কোথায় সাইন-সিগন্যাল থাকিবে তাহা সুপরিকল্পিতভাবে করিবার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকিয়া যায়। এমন ঘটনাও বিরল নহে যে, নির্মাণকাজ অর্ধেকের অধিক হইয়া যাইবার পর পরিষ্কার হইয়া উঠিল যে প্ল্যানিংয়ে ভুল ছিল, তখন আবার ভাঙিয়া গোড়া হইতে শুরু করিতে হয়। তাহার পর নির্মাণকাজ হইতে শুরু করিয়া সড়কে চলাচলের সকল ক্ষেত্রে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এখন রাস্তায় রাস্তায় আমরা কর্তব্যরত সার্জেন্ট দেখিতে পাই, যাহাদের প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয় হইতে পাশ করিয়া চাকুরি লইয়াছেন এবং ডিউটিতে নামিয়াছেন। তাহাদের সহিত থাকেন কয়েক জন করিয়া ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। অথচ তাহাদের সম্মুখেই বিশৃঙ্খলভাবে যান চলাচল করিতে দেখা যায়।

সড়ক-মহাসড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কাহারোই কাম্য নহে। আমাদের যে সামর্থ্য রহিয়াছে, যতটুকু অবকাঠামো আছেন তাহাতেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমাইয়া আনা সম্ভব হইত, যদি সড়কে শৃঙ্খলা আনা যাইত। যতক্ষণ পর্যন্ত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনোভাবেই এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার যন্ত্রণা হইতে রক্ষা পাওয়া যাইবে না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেক সুপারিশ রহিয়াছে, সেই সকল সুপারিশ বাস্তবায়নে বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হইতে হইবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করিতে হইবে সড়ক পরিবহন আইনের কঠোর প্রয়োগ। নিরাপদ সড়কের জন্য সমন্বিত একটি কার্যকর কৌশল প্রণয়ন ও তাহা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নজর রাখিতে হইবে চারিদিকে

শৃঙ্খলাই প্রথম ও উন্নতির সোপান

সামনের দিনগুলির দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরাইতে আর কী উপায়?

বাড়াবাড়ি নহে, জানিতে হইবে নিজের সীমাবদ্ধতা

যোগ্যতাই সুযোগ আনিয়া দেয়