শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাঁশ নিয়ে ভাবনা আর না 

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৪০

দেশে বাঁশের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন কম ছিল। ফলে বাঁশনির্ভর মানুষেরা ব্যাপক অসুবিধায় ছিল। বাঁশ ছাড়া কি আর আমাদের জীবন চলে? হ্যাঁ, বাঁশ নিয়ে অত্যন্ত সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। এই প্রতিষ্ঠানটি বাঁশের তিনটি নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বাঁশের এই তিনটি নতুন লাইন (প্রজাতি) উদ্ভাবনের পর মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ করেছে সংস্থাটি। এখন নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে। নিবন্ধন পেয়ে গেলেই কেল্লা ফতে। যে যত খুশি বাঁশ উৎপাদন করতে পারবে, ব্যবহার করতে পারবে, চাইলে একে-ওকে বাঁশ দিতেও পারবে। নতুন প্রজাতির বাঁশের অনেক ইতিবাচক দিক। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাঁশগুলো পরিপক্ব হয়ে যায়। অন্য বাঁশ থেকে এগুলোর ফলনও অনেক বেশি।

উল্লেখ্য, বাঁশের প্রজাতি সংরক্ষণে ১৯৭৩ সালে বিএফআরআইয়ে গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। এরপর ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (আইডিআরসি) আর্থিক সহায়তায় চট্টগ্রাম নগরীর ষোলোশহর এলাকায় বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত এই ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে গাছ এবং উদ্ভিদের ২৬টি নতুন প্রজাতির উদ্ভাবন করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি গাছের, সাতটি ওষধি গাছ এবং বাঁশের ১৩টি নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করেন এই ল্যাবরেটরির গবেষকেরা। এর মধ্যে ১৯৯০ সালে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে প্রথম মূলি বাঁশের নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন করা হয়। এর পর ২০১৯ সালে এসপার নামে বাঁশের ১৩তম নতুন প্রজাতিটির উদ্ভাবন করা হয়। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন উদ্ভাবিত বাঁশের এই তিন প্রজাতি।

লবণাক্ত মাটি ছাড়া সব ধরনের মাটিতে নতুন প্রজাতির এই তিন ধরনের বাঁশ উৎপাদন করা যাবে। জুন থেকে আগস্ট মাসে এই বাঁশ রোপণ করতে হবে। এর পর শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে আর্দ্রতার জন্য সামান্য পানি দিতে হবে। তবে বর্ষার মৌসুমে পানি সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নতুন প্রজাতির বাঁশ তিন বছর বয়সেই অন্য বাঁশ থেকে তিন গুণ বেশি বাঁশ উৎপাদন করে এবং শতভাগ কোড়লই বেঁচে থাকে। এসব বাঁশের উচ্চতা এবং আকার অন্য যে কোনো বাঁশ থেকে অনেক বেশি। এসব বাঁশের রোগবালাইয়ের আক্রমণও নেই।

বাঁশ বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভূমিকার প্রশংসা করতে হয়। করোনায় বিপর্যস্ত বাঙালির জীবনে যখন দুর্যোগের ঘনঘটা তখন তারা জাতিকে নতুন বাঁশের সন্ধান দিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। জন্ম থেকে মৃতু্য পর্যন্ত আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঁশ। বিশেষ করে, গ্রামীণ জীবনে। জন্মের পর মা-খালা, নানি-দাদিরা যে দোলনায় চাপিয়ে দোল দিতে দিতে আমাদের গান শুনিয়েছেন, সেই দোলনা তো বাঁশেরই তৈরি ছিল। আবার মৃতু্যর পর বাঁশের খাটিয়াতে চড়েই কবরে যেতে হয়। দাফনের পর মাটিচাপা দেওয়ার আগেও বাঁশ লাগে। অর্থাত্ জীবনের কোনো প্রান্তেই বাঁশ থেকে মুক্তি নেই। কিংবা বলা যেতে পারে, আমাদের জীবন কোনোভাবেই বাঁশমুক্ত নয়।

আমাদের সাহিত্যেও বাঁশের ব্যবহার আছে। ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই’। একসময় যতীন্দ্রমোহন বাগচীর এই কবিতাটি লেখাপড়া জানা বাঙালির মুখে মুখে ফিরত। এক কবি লিখেছেন, ‘বাঁশ থেকে হয় শক্ত লাঠি/ বাঁশ থেকে হয় বাঁশি/ বাঁশির সুরেই রাধার মুখে/ উঠত ফুটে হাসি।’

রাধা-কৃষ্ণের অমর প্রেমকাহিনির সঙ্গেও কী চমত্কারভাবে জড়িয়ে গেছে বাঁশ! বাঁশ থেকে যে বাঁশি তৈরি হয়, সেই বাঁশিতে সুর তুলতেন কৃষ্ণ। সেই সুরের টানে ঘর ছেড়ে বের হতেন রাধা। আর ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গেয়ে শচীন দেব বর্মণ একদা বাঙালি হূদয়ে গভীর দোলা দিয়েছিলেন! শুধু তা-ই নয়, ছোটবেলায় তেলমাখা বাঁশ বেয়ে বানরের উঠে যাওয়া ও নেমে আসার অঙ্ক তো অনেককেই করতে হয়েছে। কিন্তু একটি তেলমাখা বাঁশে একটি বানর কেন উঠতে যাবে, সে রহস্য আজ পর্যন্ত কেউ উন্মোচিত করতে পারেনি। অঙ্কটা যে ছাত্রজীবনে অনেকের জন্য বাঁশ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাঙালির জীবনের সঙ্গে বাঁশ ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে। আগেকার দিনে ঘরগৃহস্থালির নানা কাজে বাঁশ ব্যবহূত হতো। সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে বড় বড় ধানের গোলা দেখা যেত। সেই গোলা তৈরি করতে বাঁশ লাগত। ঘরের খুঁটি দেওয়ার কাজে ব্যবহূত হতো বাঁশ। আজকের দিনের মতো ব্যাংক যখন ছিল না, তখন গ্রামের প্রান্িতক মানুষের টাকাপয়সা সঞ্চয়ের জন্য বাঁশের খুঁটিই ছিল নির্ভরযোগ্য জায়গা। একবার ঢুকিয়ে দিতে পারলে সেখানে তো গিন্নির হাতও যাবে না। বাঁশের ঝুড়ি এখনো ব্যবহূত হয়। চাষির মাথায় যে মাথাল ব্যবহূত হতে দেখা যেত, সেটাও তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। জমিতে যে বেড়া দেওয়া হতো, তার প্রধান উপাদান ছিল বাঁশ (যদিও ‘বেড়ায় ক্ষেত খেলে’ তার দায় বাঁশের ওপর বর্তায় না)! বাঁশের বেড়ার ঘরও অনেক দেখতে পাওয়া যেত গ্রামে। এখন হয়তো তা আর দেখা যায় না। শখের বাগানবাড়িতে কেউ কেউ বাঁশের ঘর তৈরি করে রাখেন বটে। রাখালের হাতে বাঁশির সঙ্গে থাকত লম্বা বাঁশের লাঠি। সেসব দিন তো অতীত হয়ে গেছে। অশিষ্ট শিক্ষার্থীদের শিষ্ট বানাতে একসময় শিক্ষকদের বেতই ছিল প্রধান সহায়, যা সৃষ্টি হতো বাঁশ থেকে। বাঁশ না থাকলে এ জাতি বহু আগেই উচ্ছন্নে যেত।

আমাদের ইতিহাসের সঙ্গেও বাঁশের যোগ রয়েছে। তিতুমীর এবং তার ‘বাঁশের কেল্লার’ নাম শোনেননি—এমন ব্যক্তি বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের ওপর জমিদার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি বাঙালিদের সংঘবদ্ধ করেন এবং হাতে বাঁশ তুলে নেন। যদিও আধুনিক গোলাবারুদের মুখে তাঁর বাঁশের কেল্লা শেষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ও বাঁশ ছিল বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-লড়াইয়ের প্রতীক। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের স্বাধিকার আন্দোলনেও মানুষ অকাতরে বাঁশের লাঠি ব্যবহার করেন। ভিন্নভাবে বলা যায় বাঁশই আমাদের স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলনের একমাত্র অস্ত্র যার প্রতিটি গিঁটে গিঁটে রয়েছে পরাধীনতার শিকল ভাঙার উচ্ছ্বাস। তাই তো আজও যে কোনো আপদে-বিপদে আমরা বাঁশকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং অত্যাচারীকে বাঁশ দেওয়ার হুমকি দিই।

তবে আমাদের সমাজে দৃশ্যমান বাঁশের চেয়ে অদৃশ্য বাঁশের ব্যবহারই বেশি। কেউ কাউকে অতিমাত্রায় প্রশংসা করলে সে ব্যক্তিকে বন্ধুরা প্রশ্ন করে, তিনি কি তোমার প্রশংসা করল, নাকি বাঁশ দিল? আর আমাদের রাজনীতি মানেই তো একে অপরের মধ্যে বাঁশাবাঁশি। রাজনীতিতে এ ধরনের প্রকাশ্য বাঁশ-থেরাপি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা এমনই পাষণ্ড এক জাতি যে, বাঁশ দেওয়ার পরও খোঁচাতে ছাড়ি না। যাকে বাঁশ দেওয়া হলো তার কাছে তো খারাপ লাগবেই, অধিকন্তু যিনি বাঁশ দিয়েছেন তাকেও প্রশ্ন করা হয় আপনি যে বাঁশ দিয়েছেন তা কি গিরাযুক্ত, নাকি মসৃণ? ছোলা না আছোলা? এটা বাঁশ দেওয়ার পরিমাণ-মাত্রা অনুধাবন করার জন্য জিগ্যেস করা হয় না, খোঁচানোর জন্য করা হয়!

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বাঁশ শব্দের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। কারো বাঁশ যাচ্ছে, কেউ বাঁশ খাচ্ছে, কেউ বাঁশ দিচ্ছে। কোনো ঘটনা কারো জন্য বাঁশ হয়ে যাচ্ছে। অমুক বাঁশ খেয়েছে, অমুক বাঁশ দিয়েছে, অমুক সেধে বাঁশ নিয়েছে—এমন অনেক কথা আমরা শুনে থাকি। এই বাঁশ খাওয়া-নেওয়া-দেওয়ার বিষয়টির সঙ্গে অনেকের বংশানুক্রমিক সম্পর্কও রয়েছে। উৎতরাধিকার সূত্রে কেউ কেউ বাঁশ খেতে, দিতে ও নিতে অভ্যস্ত।

বাঁশ যতই উপকারী হোক, হোক ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ, বাঁশের এই ‘দেওয়া-নেওয়া-খাওয়া’-জাতীয় ব্যবহার আমাদের জন্য খুবই বিপদের কথা। কেউ কাউকে বাঁশ দিক, কেউ বাঁশ খাক—এটা আমরা চাই না। কিন্তু আমাদের মতো আমজনতার চাওয়ায় অবশ্য তেমন কিছু এসে যায় না। একদল মানুষ পুরো জাতিকে বাঁশ দিয়ে যাচ্ছেন। কাউন্টার ‘বাঁশ অ্যাটাক’ও যে কখনো হতে পারে—তারা সেটা বুঝতে পারছেন না! বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আমাদের উচ্চফলনশীল নতুন বাঁশের সন্ধান দিয়েছে। কাজেই কখনো যদি কাউন্টার ‘বাঁশ অ্যাটাক’ হয়, তাহলে আর যা-ই হোক, বাঁশের অভাব হবে না! কাজেই বাঁশের অপব্যবহারকারীরা সাবধান!

লেখক: রম্য রচয়িতা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সাত কন্যার স্বপ্নেও ‘আলোর নাচন’ লাগবে

মুজিবকিল্লা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্যোগ 

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার