পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছোট্ট দাবি আমাদের নজর কাড়িয়াছে। সিলেটের চণ্ডীপুরে নির্মাণ করা হইয়াছে আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বর। সেই চত্বরের কোনো পরিচর্যা তো নাই-ই, ইহার পাশাপাশি পোস্টার, লিফলেট আর প্রচারপত্রে চত্বরের ছোট দেওয়াল ঢাকিয়া গিয়াছে। লেখা না দেখিলে বোঝার উপায় নাই যে, উহা একজন স্মরণীয় রাজনীতিবিদের নামে নির্মিত স্থাপনা। আব্দুস সামাদ আজাদ শুধু সিলেটের নহে, গোটা বাংলাদেশের মানুষের নিকট একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি যে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ব্যাপারটি সেইখানেই সীমাবদ্ধ নহে।
তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী আজাদ স্কুলজীবন হইতেই রাজনীতির সহিত জড়াইয়া পড়েন এবং ভাষা আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়া বারবার কারাবরণ করিয়াছেন। সুনামগঞ্জ-৩ নির্বাচনি এলাকার মানুষ তাহাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়া বারবার নির্বাচিত করিয়াছে। এই শ্রদ্ধেয় মানুষের নামে তৈরি চত্বরটিকে অবহেলার মধ্য দিয়া কি প্রকারান্তরে তাহাকেই অবহেলা করা হইতেছে না? কে বোঝে! কাহারো নামে একটি মনুমেন্ট বা একটি চত্বর করার পেছনে প্রধানত উদ্দেশ্য থাকে, তাহাকে স্মৃতিতে রাখা এবং সম্মান জানানো। সুতরাং স্থাপনাটিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন রাখা অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
শুধু এই চত্বরটিই নহে, দেশে বহুকাল ধরিয়াই আমরা দেখিতে পাই জাতীয় স্মৃতিসৌধ, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, রায়েরবাজার শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত জাতির পিতার নামে স্থাপনা, এমনকি ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন চত্বর পর্যন্ত তৈরি হইয়াছে, যাহার যত্ন তো দূরের কথা, কোথাও কোথাও ময়লা আবর্জনা ও মলমূত্রও দেখিতে পাওয়া যায়। একদিকে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও সম্মান প্রদর্শনের ঘাটতি, অন্যদিকে দায়িত্বশীলদের যত্ন করিবার ঘাটতি চোখে পড়িবার মতো। প্রশ্ন হইল, যদি যত্নই লইতে না পারিবে তাহা হইলে নির্মাণ কেন? যেইখানে সম্মান নাই, যেইখানে কৃতজ্ঞতা নাই, সেইখানে সম্মান প্রত্যাশা করিয়া সৌধ তৈরি, চত্বর তৈরি করিয়া লাভ কী? দেশের আনাচকানাচে ছোট-বড় এই সকল স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভাল করা আহামরি কোনো পরিশ্রমসাধ্য বা ব্যয়বহুল কর্ম নহে।
দেশের সর্বত্র সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে টিআর জিআর নামে কাবিখা, কাবিটা নামে নানাবিধ সহায়তা দেওয়া হইয়া থাকে ছোটখাটো সংস্কার ও উন্নয়নের নামে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমপি মহোদয়রা রহিয়াছেন, যাহারা ব্যক্তিগতভাবেও সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কাজে ও সংস্কারে অর্থ ব্যয় করিয়া থাকেন। এই সকল টিআর, জিআর, কাবিখা, কাবিটা হইতে মাত্র অর্ধেক টন খাদ্য সমমূল্যের অর্থ ব্যয় করিলেই ইহা পরিচ্ছন্ন ও সংস্কার করিয়া রাখা সম্ভব। কিন্তু কাহারো যেন কোনো বিকার নাই। আমরা আরো দেখিতে পাই, প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের নামে সরকারি জমিতে ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপনা তৈরি করিয়া দখল করিবার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরিয়া চালু আছে। ইহা কেবল অন্যায় নহে, মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যানড্রিউ জ্যাকসন বলিয়াছিলেন, ‘একজন সুনাগরিক তার জাতির সম্মান, জাতির পরিচ্ছন্নতাকে নিজের সম্মান ও পরিচ্ছন্নতা হইতে পৃথক করিয়া দেখিতে পারে না। সে উহাকে শুধু মূল্যবানই মনে করে না, বরং পবিত্র দায়িত্ব বলিয়াও মনে করে।’ এই সত্য উপলব্ধি না করিতে পারিলে একটি দেশে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা, জাতির প্রাতঃস্মরণীয়দের স্মরণ করাইবার প্রয়াস কেবল বৃথাই যায়। সুতরাং আমরা মনে করি, স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীলরা যদি তৎপর হইয়া উঠেন, বিভিন্ন স্থাপনা দেখভাল করিবার তাগিদ অনুভব করেন তাহা হইলে সাধারণ মানুষও সচেতন হইয়া উঠিতে বাধ্য হইবে।
