স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতির যে অহংকার ও গৌরব আমরা অন্তরে লালন করি তার ভিত্তি স্থাপনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সংগ্রাম, ত্যাগ, সৃষ্টিশীলতা আজ শুধু একটি ইতিহাসের অধ্যায় নয় বরং তা এক বিস্ময়কর কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। গত প্রায় পৌনে এক শতাব্দীতে এই পূর্ববঙ্গে, পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে আধুনিক চারুশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও পরিচর্যার বিষয়টি খুব সহজ ছিল না।
সারা দেশে নাহলেও এখন দেশের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে চারুকলা শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। কোথায়ও তা উন্নীত হয়েছে অনুষদে। কোথাও বা ইন্সটিটিউটে। চারুকলা বা ফাইন আর্ট শিক্ষা কেবল নিছক ছবি আঁকা, ভাস্কর্য গড়া কিংবা নানা কৌশলের গ্রাফিক্স প্রিন্ট, বাণিজ্যিক নকশা গড়া নয়। এর সঙ্গে আজ অধ্যয়ন করতে হচ্ছে প্রকৌশল বিদ্যার ড্রাফটিং; পড়তে হচ্ছে বাংলা-ইংরেজি সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলার ইতিহাস, এসথেটিক্স বা নন্দনতত্ত্ব, শিল্প-উপকরণবিদ্যা সেই সঙ্গে পৃথিবীর নৃতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব। গত কয়েক দশক ধরে আবার যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার গ্রাফিকবিদ্যাও, যার মাধ্যমে নানা ডিজিটাল সফটওয়্যার ব্যবহার করে শিল্পীরা ডিজিটাল ডিজাইন, পেইন্টিং, অ্যানিমেশনের কাজ করে নিজেদেরকে আধুনিক সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে হালনাগাদ করে নিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিচ্ছে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। উচ্চশিক্ষার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুকলার নানা শাখার গবেষণায় দেওয়া হচ্ছে এমফিলও পিএইচডি।
সার্বিক বিচারে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকলা শিল্পের সৌন্দর্য ও বাঙালি জীবনবোধ প্রকাশের সর্বশীর্ষে বা শীর্ষতম বিন্দুতে অবস্থান করে। তার শিল্পের নান্দনিক শ্রেষ্ঠত্বের চরম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তার শিল্পকর্ম মনপ্রাণ দিয়ে অবলোকন করা যায় কিন্তু অনুকরণ করা যায় না। তার ছবি দর্শককে চেনা জগতের এক দুর্লভ চেতনায় যেভাবে মোহিত ও আচ্ছন্ন করে, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের আর কোনো শিল্পীর ছবি সেভাবে দর্শকের সঙ্গে নৈকট্য সৃষ্টি করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট সংশয় আছে। তিনি চিত্রকলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ও বাঙালিকে যুগপত্ভাবে পরিচিত ও সম্মানিত করেছেন।
ব্রিটিশ-ভারতের পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে বিশ্ব জুড়ে এক ভয়াল দুঃসময়ে ব্রিটিশ সরকারের স্বল্প বেতনভুক পুলিশের এএসআই শেখ তমিজউদ্দিনের তৃতীয় সন্তান জয়নুল আবেদিনের জন্ম। ময়মনসিংহ শহরে তার স্বপ্নময় কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয়। শিল্পী হওয়ার অদম্য বাসনাতাড়িত একটি অসচ্ছল পবিবারের সন্তান জয়নুল আবেদিন কি কঠিন সংগ্রাম ও প্রতিজ্ঞায় ১৯৩২ সালে কলকাতায় এসে সেখানকার আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেন। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে বিংশ শতাব্দীর মানুষ। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যে অভিঘাতে সারা বিশ্বের মতো ভারতবর্ষও প্রকম্পিত হয়েছে তা তার শিশুমনে রেখাপাত না করলেও সেই অভিঘাতের ভেতরে চরম ঝুঁকির মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
সাতচল্লিশ উত্তর পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পচার্য জয়নুল ছবি আঁকার পাশাপাশি, চারুকলা শিক্ষা বিস্তার ও বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান লোকশিল্পকে তুলে ধরার নানামুখী কাজ করেছেন সব্যসাচীর মতো। জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য দুর্লভ সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন, যার তালিকা দীর্ঘ। শিল্প বিষয়েই তিনি ১৯৫১-৫২ সালের দিকে ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ফলে পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তার ছবির শৈলীও পরিবর্তিত হয় মৌলিক নিজস্ব রসে।
ধারণা করা হয়, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। তিনি যেভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরেছেন তার পরিচয় মিলে তার বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোতে। চিত্রকর্মগুলো হচ্ছে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা, ১৯৬৯ সালে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল ছবি ‘নবান্ন’, ‘কাক’, ১৯৫১ সালে আঁকা ‘বিদ্রোহী গরু’, ‘সাঁওতাল রমণী’, ১৯৫৯ সালে আঁকা ‘সংগ্রাম’, ‘মই দেওয়া’, ১৯৫৭ সালে আঁকা ’নৌকা’, ১৯৭৩ সালে আঁকা ‘মনপুরা-৭০’, ১৯৫১ সালে আঁকা ‘ময়ূরাক্ষী অতিক্রম’, ১৯৫৩ সালে প্যাস্টেলে আঁকা ‘দাঁড়ানো নারী’, ১৯৭০ সালে আঁকা ‘ঘরে ফেরা’, চল্লিশের দশকে আঁকা দুমকার নিসর্গচিত্র, ১৯৭২ সালে আঁকা ‘বিদ্রোহী গরুগুলো’, ‘দুই বেদেনি’, ১৯৫৩ সালে আঁকা ‘পাইন্যার মা’, ১৯৫৫ সালে আঁকা ‘গুণটানা’, ১৯৫১ সালে আঁকা ‘ব্রহ্মপুত্র তীরে ফেরির জন্য অপেক্ষা’, ১৯৭১ সালে আঁকা ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি। বইয়ের প্রচ্ছদ ও নানা প্রকাশনার ইলাস্ট্রেশনে তিনি আজও অনতিক্রম্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দেশের প্রথম হাতে লেখা যে সংবিধান তৈরি হয় তার তত্ত্বাবধান করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তাতে প্রধান শিল্পী ছিলেন হাশেম খান। নকশা আঁকেন জুনাবুল ইসলাম, সমরজিত্ রায় চৌধুরী ও আবুল বারক আলভী। পুরো গ্রন্থটির লিপিকার ছিলেন আব্দুর রউফ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সংবিধানটি এরকম শৈল্পিক সৌকর্যে তৈরি করার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের এ দায়িত্ব দেন।
শিল্পাচার্য জয়নুলের অনেক অনেক বিখ্যাত উক্তি তার সরাসরি ছাত্র-শিষ্যদের আজও ঠোঁটস্হ আছে। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে তিনি জগদ্বিখ্যাত চিত্রমালা এঁকে মানুষের হৃদয়কে যেভাবে আলোড়িত করেছেন ঠিক সেভাবেই তিনি বঙ্গজনদের রুচির দুর্ভিক্ষেরও সন্ধান দেন। এ বিষয়টি মেলে তার এক বক্তৃতায়, যেটি তার জন্মশতবর্ষে ছাপা হয় একটি সাময়িকীতে। এতে তিনি বলেন, ‘আজ এ দেশে সমাজ-জীবনে চারিদিকেই দৈন্য। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সংকটের বোঝা যেন চেপে বসে আছে। এই সর্বাঙ্গীণ দৈন্যের কারণ বহুবিধ হতে পারে, তবে আমার চোখে এর যে একটি কারণ খুব বড় হয়ে ঠেকেছে, তা হচ্ছে রুচির দুর্ভিক্ষ।’
লেখক: সাংবাদিক।
