প্রতিযোগিতার মধ্যেই টিকিয়া থাকিতে হয়

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:২২

স্বনামধন্য লেখক ন্যান্সি র‌্যানডফ পার্সি বলিয়াছেন, ‘প্রতিযোগিতা সর্বক্ষেত্রেই ইতিবাচক। ইহা যে কাউকে উন্নতি করিতে সাহাঘ্য করে।’ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা। বড়বড় রাষ্ট্র প্রতিযোগিতা করিয়া থাকে খনিজ সম্পদ লইয়া, রাষ্ট্রীয় সীমানা লইয়া অথবা আধিপত্য লইয়া, যাহার পিছনে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে। 

এই প্রতিযোগিতায় অন্যকে ছাড়াইয়া যাইবার প্রচেষ্টার কারণে তাহারা জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটায়, মহাকাশে কে কাহার আগে পৌঁছাইবে এবং স্হান করিয়া লইবে সেই চেষ্টায় থাকে (তবে নিশ্চয়ই প্রতিযোগিতা করিতে গিয়া সংঘাত হানাহানি কাম্য নহে। উহাই প্রতিযোগিতার একমাত্র নেতিবাচক দিক।)। জগত্ সৃষ্টির পর হইতেই মানবজাতি শুধু নহে, পশুসমাজেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান রহিয়াছে। বলা যায়, প্রতিযোগিতার কোনো শুরু নাই, প্রতিযোগিতা লইয়াই আমরা জন্মগ্রহণ করি। আমরা যখন স্কুলজীবনে প্রবেশ করি, সেইখানেই প্রতিযোগিতাটি প্রথম প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা স্কুলেই শুরু হয় না। এমনকি মাতৃগর্ভে স্হান করিয়া লইতেও প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হয়। ইহার অর্থ হইল, আমরা সহজাতভাবেই প্রতিযোগিতার অংশ। যে এই প্রতিযোগিতায় নামিবে না, তাহাকে পিছাইয়া পড়িতে হইবেই। এই কারণেই বিবর্তনবাদ পড়িয়া ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসার বলিয়াছিলেন ‘সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট’। অর্থাত্ যোগ্যরাই কেবল টিকিয়া থাকিবে।

বর্তমান সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি বিশদতর হইয়াছে। পালটাইয়াছে প্রতিযোগিতার ধরন। রাষ্ট্রগুলির পাশাপাশি ব্যক্তিমানুষের জীবনেও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বাড়িয়াছে, ধরন বাড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া, বর্তমান যুগে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা অধিক তীব্র হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রতিযোগিতা ধনী-দরিদ্র সর্বদেশেই বিরাজমান, সর্বশ্রেণির মধ্যেই বিরাজমান। তবে ইহা মনে রাখা দরকার যে, এই প্রতিযোগিতার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষা, মেধার বিকাশ ও মান গঠন। সেই সঙ্গে নিষ্ঠা ও সঠিক ব্যবস্হাপনা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। পরিশ্রমী প্রতিযোগী সর্বদা চূড়ান্ত শিরোপা হাতে না পাইলেও তাহার প্রতিযোগিতা বৃথা যায় না। পৃথিবীতে এখন অধিক বৈচিত্র্যময় পেশা রহিয়াছে। যিনি যেই পেশাতেই থাকুন, নিজের পেশায় নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও মনোযোগ থাকিলে অবশ্যই তিনি সফলকাম হইবেন। এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হইয়া ভাগ্যান্বেষণের কোনো সুযোগ নাই। ইংরেজিতে একটি কথা রহিয়াছে, ‘তুমি সকল সময় প্রতিযোগিতায় প্রথম হইবে তাহা নহে, কিন্তু তোমাকে সত্যিকার প্রতিযোগী হইতে হইবে।’

বর্তমান পরিস্হিতি ইহাই সাক্ষ্য দেয় যে, যাহারা প্রতিযোগিতায় নামিতে নারাজ তাহাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হইয়া পড়া অস্বাভাবিক নহে। ইহা ঠিক, বর্তমান করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু বাংলাদেশ নহে, সারা বিশ্বেই মন্দাবস্হা তৈরি হইয়াছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরো তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। বহু দেশে শুধু জীবনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সরকারগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ব্যাবসায়িক সম্প্রদায় তাহাদের উত্পাদন ও সরবরাহ লইয়া বিপাকে রহিয়াছে। কিন্তু তাহার পরও যদি নিষ্ঠার সহিত, সঠিক ব্যবস্হাপনার মধ্য দিয়া কেহ আগাইয়া যায়, নিজের প্রতি আস্হা রাখিতে পারে তাহা হইলে বিফল হইবার আশঙ্কা থাকে না। 

মনে রাখা দরকার, পেশাগত জীবনের সর্বক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা, তাহা হোক কেরানির চাকুরি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, উত্পাদনমুখী ব্যবসায় অথবা কৃষি উত্পাদন। বর্তমান যুগের এই প্রতিযোগিতায় যেই সকল গুণ প্রয়োজন তাহার অন্য একটি হইল ধৈর্য। ধৈর্য কেবল একটি মানবিক গুণই নহে, ইহা মানুষের বিপদসংকুল অবস্হায় দাওয়াইয়ের কাজ করিয়া থাকে। তাই ধর্মগুলির দিকনির্দেশনা ও পরামর্শে ধৈর্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং করোনাকালের বর্তমান পরিস্হিতি যতই দুঃসংবাদ বহিয়া আনুক, ধৈর্য, নিষ্ঠা, যোগ্যতা ও সঠিক ব্যবস্হাপনাই যে উত্তরণ ঘটাইতে বড় ধরনের সাহাঘ্য করিতে পারে, সকলের মনে রাখা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন