গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একের পর এক জেব্রার মৃত্যু হইতেছে। গতকাল সকালেও একটি জেব্রার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয় অনলাইন গণমাধ্যমগুলিতে। ইহা লইয়া চলতি মাসেই ১০টি জেব্রার মৃত্যু হইল।
সর্বশেষ মারা যাওয়া জেব্রাটি অসুস্থ ছিল। চলতি মাসেই একটি পার্কে ১০টি জেব্রার মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক। এমনকি বাকি যে ২১টি জেব্রা রহিয়াছে, তাহার মধ্যে আরো একটি অসুস্থ। এই অসুস্থতার কারণ যথাশিগ্গির উদ্ঘাটন করিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
গতকালের খবর অনুযায়ী অসুস্থ জেব্রার চিকিৎসায় আবারও মেডিক্যাল বোর্ডের সভা বসিবার কথা। ইহার পূর্বে পার্ক কর্তৃপক্ষ জেব্রাগুলোর মৃত্যুর জন্য প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ও নিজেদের মধ্যে মারামারিকে কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন। যদি খাবার হইতে এই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ আসিয়া থাকে, তাহা হইলে সেই খাবারের উত্স সম্পর্কেও বিস্তারিত খোঁজখবর লওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নিজেদের মধ্যে মারামারির কারণে এতগুলি জেব্রার মৃত্যুর বিষয়টি অনেকের নিকট বিশ্বাসযোগ্য হইতেছে না। কেহ কেহ বলিতেছেন, পুরুষ জেব্রাগুলির মধ্যে কে পূর্বে প্রজনন করিবে সেই জন্য নিজেদের মধ্যে মারামারি লাগিয়া যায়; কিন্তু ইহার পূর্বে মারামারি লাগে নাই কেন? বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বেষ্টনীর মধ্যে থাকা জেব্রা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ায় এমন কোনো নজির নাই। তাহা ছাড়া জেব্রার কোনো শিং নাই। কোনো কারণে তাহাদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হইলেও তাহাতে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া কোনো জেব্রা মারা যাইবার কথা নহে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে গত আট বত্সরে বাঘ, জিরাফ, ক্যাঙ্গারু, জেব্রাসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু ঘটিয়াছে। মারা গিয়াছে দুর্লভ কিছু পাখিও। সর্বশেষ গত বৎসরের ২৩ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত গরমে একটি সাদা সিংহের মৃত্যু হয়। বনজঙ্গল কিংবা পার্কে যেকোনো সময় যে কোনো প্রাণীর মৃত্যু হইতেই পারে; কিন্তু সেই মৃত্যু যদি অস্বাভাবিক ও কাহারো অবহেলার কারণে হয়, তাহা হইলে মানিয়া লওয়া যায় না। যে কোনো পার্কে পশু-পাখিকে খাবার দেওয়ার পূর্বে তাহা পরীক্ষানিরীক্ষা করিবার নিয়ম রহিয়াছে।
এই ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় হইয়াছে কি না, তাহা একটি বড় প্রশ্ন। এই সংক্রান্ত তদন্ত কমিটিকে তাহা বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্বহীনতা থাকিলে তাহাও উদ্ঘাটন করিতে হইবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উচিত জেব্রাগুলির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজিয়া বাহির করিয়া দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ইহার পূর্বে একজন চিকিৎসকের বরাত হইতে জানা গিয়াছিল, হঠাৎ করিয়া গায়ের তাপমাত্রা বাড়িয়া যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে ২০ হইতে ২৫ মিনিটের মধ্যে জেব্রা মারা যায়। মারা যাওয়া জেব্রাগুলির অধিকাংশই স্ত্রী জেব্রা। বাকি যে স্ত্রী জেব্রাগুলি রহিয়াছে, তাহার সকলই অন্তঃসত্ত্বা।
যদি এই স্ত্রী জেব্রাগুলিও কথিত ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের শিকার হয়, তাহা হইলে এই গুরুত্বপূর্ণ সাফারি পার্কের জেব্রার পরবর্তী বংশ বিস্তার ব্যাহত হইবে চরমভাবে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের মতো এমন জাত ও সংখ্যাধিক্য জেব্রা দেশের কোথাও নাই। এইবার করোনার সময় জেব্রার ভালো প্রজনন হইয়াছে। ইহাতে জেব্রা রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হইয়াছিল; কিন্তু হঠাত্ করিয়া এবং অল্প সময়ের মধ্যে ১০টি জেব্রার মৃত্যু আমাদের জন্য দুঃসংবাদ বহিয়া আনিয়াছে।
অতএব, অবশিষ্ট জেব্রাগুলির প্রতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও যত্ন বাড়াইয়া দেওয়া উচিত। এই মুহূর্তে যেই সকল ব্যাকটেরিয়ার ভ্যাকসিন নাই, সেই সকল ব্যাকটেরিয়া হইতে বাঁচাইতে খাবারের সহিত অ্যান্টিবায়োটিক পাউডার ব্যবহার করা প্রয়োজন। পশু-পাখির যত্ন-আত্তি বাড়াইতে এই সাফারি পার্কের জনবলের সংখ্যাও বাড়াইতে হইবে।
