আমি বরিশালের মেয়ে। সেই বরিশাল, যাকে নিয়ে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। ছোট্টবেলায় আমাদের বলা হতো, বরিশাল নাকি প্রাচ্যের ভেনিস। তখনো উত্তর-পশ্চিম ইতালিতে অবস্থিত ভেনিস শহরটি খুব ভালো চিনতাম না। অবশেষে অনেক বছর বাদে সুযোগ হলো ভেনিস ভ্রমণের। কাছ থেকে দেখলাম ‘সিটি অব রোম্যান্স’ কিংবা ‘সিটি অব মাস্ক’ নামে খ্যাত ভেনিস শহর।
সম্প্রতি বরিশালের ছেলে মীর সাব্বিরের সিনেমায় একটা ডায়ালগ শুনলাম,
‘রতনে রতন চিনে,
শুয়োরে চিনে কচু
ইস্টিশনের সারেং চিনে
চিংড়ি মাছ আর কদু’।
আমারও হয়তো সেই অবস্থা। যার জন্য ১ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ভাড়া গাড়িতে চড়ে বলনিয়া থেকে ভেনিসে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে সামনে তাকাতেই ভেনিসকে দেখে মনে হলো—আরে, এ তো বন্যাস্নাত ঢাকা শহর! নব্বইয়ের বন্যায় আমরা শহরে নৌকায় চড়ে চাচার বাসায় যেতাম। ভেনিসও তো দেখি তেমনই। হেঁটে চলো কিংবা ভেজা পথে; পার্থক্য শুধু আকাশে, বাতাসে আর মানুষে। ভেনিসের দালানকোঠা সব হাঁটুপানিতে ডোবা। আকাশ অনেক নীল, ধোঁয়ায় ঢাকা না। বাতাস অনেক শুদ্ধ। বাতাসে না আছে সিসা, না আছে দুর্গন্ধ, না আছে শব্দদূষণ। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের তালিকায় ঢাকা সবচেয়ে দূষিত শহরের মধ্যে অন্যতম। ভেনিস শহর শুদ্ধ বাতাসের তালিকায়।
১১৮টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ভেনিসকে যুক্ত করেছে চার শতাধিক ব্রিজ। খালগুলো শহরটাকে আলাদা করেছে, ব্রিজগুলো দ্বীপগুলোকে এক করেছে। ভেনিসকে বলা হয় খালের শহর। বরিশালকে বলা হয় নদীর শহর। জীবনানন্দ দাশ যেই শহরকে নিয়ে বারবার লিখেছেন—
‘সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে’
আকাশ-বাতাসের চেয়েও ঢাকা আর ভেনিসের সঙ্গে প্রকট যেই পার্থক্য, তা হচ্ছে মানুষে মানুষে। ভেনিসের খালের দুই ধারে নিঃশব্দে মানুষ ছিল মুখোশের দোকানে। গ্র্যান্ড ক্যানেলের দুপাশের হাঁটা পথে একটু পর পর বিচিত্র সব মনোহর মুখোশের পসরা—চেঁচিয়ে ডাকছে না দোকান থেকে। নেই কোনো হাইড্রোলিক গানের শব্দ। প্লাস্টিকের বোতল ভাসছে না পানিতে। ওয়াটার বাসে উঠতে কেউ কাউকে মাড়াচ্ছে না। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পায়ে হেঁটে পৌঁছলাম সেইন্ট মার্ক স্কয়ারে অবস্থিত ব্যাসিলিকা চার্চে। কেউ ধাক্কা দিল না। পা থেকে মাথা অবলোকন করল না। ধর্মের কল কেউ বাতাসে নাড়াল না। বড়জোর ৬.৫ ফুট গভীর গ্র্যান্ড ক্যানেল। যেই খাল শহরটাকে দুই ভাগে ভাগ করেছে, যার মধ্যে বয়ে চলে এই গ্র্যান্ড ক্যানেল। কিন্তু এই খালে নামা নিষেধ। নামলে জরিমানা। তাই কাউকে নামতে দেখলাম না। নামলে কি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ধরবে? কে এসে ফাইন করবে? জানি না। কিন্তু লাঠি হাতে উর্দি পরা কাউকে চোখে পড়ল না। খালে শুধু ভাসছে ওয়াটার বাস, সি-ট্রাক, গন্ডোলা।
অথচ ভেনিসেও বাঙালির অভাব নেই। বাঙালি হকার বাংলাতেই ট্যুরিস্টদের বলছেন, ‘ওয়াটার ওয়াটার, ঠাণ্ডা গরম—ওয়াটার ওয়াটার’। বাঙাল শরীরে জরাজীর্ণ পোশাক। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে তারা এসেছে দালালের হাত ধরে ইতালি। আমাদের ট্যাক্সিচালকও ছিলেন বাঙালি। ময়লা শার্ট, ক্লান্ত শরীর। বললেন, নৌকা থেকে লাফ দিয়ে সাঁতরে উঠেছেন তীরে। ফিরবার সব পথে কাঁটা বিছানো—‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত’ এখন। ২৫ জানুয়ারিতেও সাত জন বাংলাদেশি মারা গেলেন একই পথে। কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার লিখেছিলেন, ‘দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কী মহীতে’—দুঃখের সাগর তো পাড়ি দেওয়া হলো, কিন্তু সুখ কি এলো? ভেনিস হওয়া সত্যিই শক্ত হবে না আমাদের জন্য। কিন্তু কঠিন হবে মানুষ হওয়া—‘আবার তোরা মানুষ হ’ প্রকল্পটাই শক্ত। মানুষের বাসের অনুপযোগী শহরে এখনো অতিথি পাখি আসে। এরপর আমরা অতিথিপরায়ণ জাতি তাদের জাপটে ধরে চালান দিই রেড সিগন্যালে। আমরা সেই অতিথি কিনে জবাই করে খাই। আমরা যারা গাড়িতে চড়ি, যাদের সন্তান শহরের সবচেয়ে ভালো স্কুলে পড়ে আর স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় পরিবেশদূষণের কিট আবিষ্কার করে সেরা প্রজেক্টের পুরস্কার জিতে নেয়।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তোমার লোভ আছে তাই তুমি দেয়াল গাঁথো, আমার লোভ আছে তাই আমি সিঁধ কাটি’। এই লোভে লোভেই আমাদের ক্ষয়। মূর্খ পাখি শিকারি চকচকে টাকা হাতিয়ে আমাদের মূর্খ বানিয়ে চলে যায়। গাড়ি সিগন্যাল ছাড়তে ছাড়তে দরদামে জিতে যাই আমরা। তবে এত দিন প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের ভেনিসের মধ্যেই জল গড়াচ্ছিল। কিন্তু এবার ঢাকা নাকি ভেনিস হবে!
স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়-বিষয়ক মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, ৫৭ খালের দেশ ঢাকাকে এভাবে খালদস্যুর হাত থেকে মুক্ত করা হবে যে, মানুষ ভেনিসে না গিয়ে ঢাকায় বেড়াতে আসবে। এ তো ফরচুন বরিশাল বনাম ঢাকা প্লাটুন! বিপিএলের আসরের মতো ঢাকা কি পারবে কেড়ে নিতে বরিশালের মুকুট? রাজধানীর ভেনিস যাত্রা শুভ হোক। খাল কেটে সাফ করে এবার কুমির আসবে, না ইবনে বতুতা, তা দেখার প্রতীক্ষায় রইলাম।
লেখক: কর্মকর্তা, সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট, গ্রামীণফোন।
