এক বৃদ্ধা তার নাতি-নাতনিদের অ্যাকশন মুভি দেখার শখ বরদাস্ত করতে পারতেন না। বলতেন, অপসংস্কৃতি। পর্দায় এত হিংসার চাষ, দুমদুম ও ফটাস ফটাস তার কাছে ভালো লাগে না। নাতি-নাতনিদের কেন তা ভালো লাগে—তা ভেবেই অবাক হতেন বৃদ্ধা। সবাই যে তার মতো করে ভাববেন, এমন চিন্তা করার কারণ নেই।
হয়তো তার মনে জেগে থাকা ছোটবেলার ফটাস ফটাস করে খেলনা পিস্তল দিয়ে ক্যাপ ফাটানো, কুকুর-বিড়ালকে ভয় দেখানো এসবই উঁকি মারে; বলে দেয় সেগুলো নেহাতই ভুল মজা লাগার বস্তু ছিল, ছেলেমানুষি ছিল। কিন্তু বৃদ্ধা ভুলে যান, সে সময়ের ওসব ক্ষমতা-ক্ষমতা খেলার মজা মানুষের রক্তে প্রবাহিত হয় অজান্েতই। শরীর বড় হয়, কিন্তু সেই মোহ তাকে ছাড়ে না। কেন ছোট ছেলেদের হাতে খেলনা পিস্তল, স্টেনগান তুলে দেওয়া- এমন প্রশ্ন বৃদ্ধার বয়সকালে কেউ কেউ তুলতেন। কিন্তু জনপরিসরে যেন চর্চার বিষয় এটা নয়!
হিংসা আমাদের অন্তর গিলে খেয়েছে। হিংসা আমাদের রক্তে মিশে গিয়েছে। খেলনা পিস্তলে এখন আর আমাদের মন ভরে না, আসল পিস্তল প্রয়োজন পড়ে। বৃদ্ধা কি আর এসব বুঝবেন? তিনি যে বড্ড সেকালের! একালে বড় হওয়া নাতিটি, ক্ষেত্রবিশেষে নাতনিটি বরং এসব পাত্তা না দিয়ে রক্তের হোলিখেলায় তৃপ্তির সঙ্গে মেতে থাকে। আর আমরা, সমাজের সব বুদ্ধিমান মানুষ অবশ্য ঐ কিছু বোকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাদ দিয়ে তা বাড়িয়েই চলেছি। মাঝেমধ্যে কারো কারো তর্ক বা প্রশ্ন কি আর সেই প্রবল শক্তিকে থামিয়ে দিতে পারে? হিংসা, লড়াই, যুদ্ধের ধ্বনি ও ফাঁকা আওয়াজ সবই তরুণ যোদ্ধাদের রক্তকে উত্তেজিত করে। ভোট এলে তো কথাই নেই! ভোট বা ভোটারদের জন্য নয়, চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থীর জন্য বিছানো সব ধরনের বাধা সরাতে বিশেষ ভূমিকায় যোদ্ধারা প্রস্ত্তত। ভোটের দিনের জন্য অপেক্ষা নয়, তার আগেই মাঠ থেকে সরাতে হবে শত্রুকে, সরাতে হবে সব বাধা। নিজের প্রার্থীর বিজয়কে আগে থেকেই নিশ্চিত করতে শত্রু নিধন, ভয় দেখিয়ে বসিয়ে দেওয়া, রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে পায়ের তলা রক্তাক্ত করা অথবা ভাচুর্য়াল দুনিয়ায় মস্তবড় করে হুমকি-ধমকি দেওয়া। তাতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে কি আর হাতের পিস্তলটি বসে বসে ঘাস খাবে? ওটিই তখন দেখাবে রক্ত হোলির উত্তেজনা।
পুরো সমাজটাই এখন হিংসার প্রবাহে ভেসে চলেছে। খেলনার দোকানগুলোতে খেলনা পিস্তল, রাস্তা-মহল্লায় গণপ্রহার, হিংসায় হিংসায় সালিশি, মোবাইল গেমে যুদ্ধ যুদ্ধ আর খতমের খেলার জনপ্রিয়তা আমাদের যে মানসিকতাকে নগ্ন করে জনতার উঠানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তা নিখাদভাবেই বাড়িয়ে তুলেছে হিংসারতি। হিংসায় শুরু, হিংসায় শেষ।
দেশের অনেক মানুষ, অনেক রাজনীতিবিদ ও বরেণ্য ব্যক্তি যেটা বুঝতে পারছেন না কিংবা বুঝেও অস্বীকার করছেন, তা হলো গত কয়েক দশকে অবিচার, হিংসা, বিদ্বেষ সমাজের অনেক গভীরে শিকড় ছড়িয়ে ফেলেছে। অসংখ্য ছোট ছোট সামাজিক-অসাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে, ধর্মের গোঁড়ামি পথে, রাজনীতির পঙ্কিল পথে, ক্ষমতাশালীদের স্বার্থের ঢাকঢোলে, সরকার আর রাষ্ট্রের চোখ বুজে থাকার পথ ধরে ধীরে ধীরে অনগ্রসর শ্রেণি এই অশান্ত হিংসার ছাতার তলায় সমবেত হয়ে পড়েছে। হিংসার রাজনীতি, হিংসার সমাজ নীরবে তার ভিত তৈরি করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যে মতের বা যে মেরুরই হোক, ঠিক এমন সমীকরণই মেনে নিয়েছে।
নিজের মতো করে সত্য প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ‘শান্িত মন্ত্রণালয়’ আছে দেশে দেশে। এই শান্িত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে আছে সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করা, আর লিখিত ইতিহাস প্রয়োজনমতো পালটে দেওয়া। সব শক্তি নিজের হাতে নেওয়ার একনায়কতান্ত্রিক অস্ত্র ‘ডাবল থিংক’। অর্থাত্, একই সঙ্গে জানা ও না-জানা, একই সঙ্গে সত্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন হওয়া এবং অতি যত্ন সহকারে মিথ্যার জাল বুনে চলা, একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করা, একই সঙ্গে সেই দুটো কথাতেই বিশ্বাস করে চলা, নৈতিকতার দাবি করে নৈতিকতাকে নস্যাত্ করে দেওয়া, প্রয়োজনমতো কোনো কথাকে ভুলে যাওয়া, প্রয়োজন পড়লে ফের তাকে স্মরণে নিয়ে আসা। আর এই সর্বনাশা মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে তৈরি হয়ে পড়ে একশ্রেণির ভক্ত যোদ্ধা, হিংসার লড়াকু সৈনিক। এটাই আজকের সমাজের বাস্তব নির্মাণ। বৃদ্ধা তা না বুঝলেও এ ধ্বংসরথ থেমে যাবে না। কেননা, সমাজ এখন তামস ত্রিভুজের শিকার—যেখানে লুকিয়ে আছে স্বার্থপরতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
দুর্দশাটা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির নয়। দুর্দশাটা পুরো সমাজের। এটাই দুর্ভাগ্য। এই ফ্যাসিবাদী, সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে যারা দৃঢ় অবস্হান নিতে পারতেন, সেই সচেতন নাগরিক সমাজ হয় দ্বিধাবিভক্ত, আর না-হয় ভয়ে কুঁকড়ে থাকা জীব। তর্ক নয়, আলোচনা নয়—একেবারেই নিরাপদে থেকে যাওয়া, একেবারেই সবকিছু সয়ে যাওয়া। খেলনা পিস্তল কখন যে খেলতে খেলতে আসল পিস্তল হয়ে হাতে এসেছে, তা যেন টেরই পায়নি কেউ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা
