বিপদ মোকাবিলা করিতে হইবে সম্মিলিতভাবে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ১০:০৪

কথায় আছে— একা রামে রক্ষা নাই সুগ্রীব দোসর। এক ‘কোভিড-১৯’ ভাইরাসের ধাক্কায় গত দুই বৎসর ধরিয়া বিশ্ব টালমাটাল, এইবার তাহার দোসর হইতে পারে নিওকভ! নিওকভ নামের এই নয়া স্ট্রেনের অস্তিত্ব লইয়া বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্থা অবশ্য বলিয়াছে যে, ইহা লইয়া আরো বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। বস্তুত, মানুষ জ্ঞানপ্রযুক্তিতে যতটা আগাইয়াছে সেই তুলনায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনো বহু যোজন পিছাইয়া রহিয়াছে। অন্ধকার ঘরে যেমন রজ্জুকেও সর্প বলিয়া ভ্রম হয়, তেমনি চলমান কোভিড মহামারির আঁধারের মধ্যে এই সংক্রান্ত যে কোনো নূতন খবর আমাদের আশঙ্কিত ও আতঙ্কিত করে।

বিজ্ঞানীরা বলিয়াছেন, মানুষের শরীরে আসা ৭৫ শতাংশ সংক্রামক রোগই আসে কোনো না কোনো বুনো জন্তু-জানোয়ার ও প্রাণী হইতে। দুই বত্সর ধরিয়া যেই করোনা ভাইরাস মানবজাতির সহিত পাঞ্জা লড়িতেছে, এই ধরনের বিভিন্ন করোনা ভাইরাস স্তন্যপায়ী প্রায় সকল প্রাণীর মধ্যেই সংক্রমিত হইতে দেখা যায়। ইহার মধ্যে বাদুড়কে ধরা হয় এই ধরনের ভাইরাসের সবচাইতে বড় প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার। সহজ কথায়, করোনা ভাইরাস হইল ভাইরাসের বেশ কিছু প্রজাতির একটি পরিবার। প্রজাতিভেদে এই সকল ভাইরাসের সংক্রমণ সাধারণ সর্দি-কাশি হইতে শুরু করিয়া শ্বাসনালির প্রাণঘাতী ব্যাধিরও কারণ হইয়া উঠিতে পারে। করোনা ভাইরাসের কয়েকটি প্রজাতি ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী কয়েকটি মহামারির বিস্তার ঘটাইয়াছে। এই ভাইরাসের মিউটেশন তথা প্রোটিনের পরিবর্তন বেশ জটিল। শুধু প্রোটিন নহে, ইহার সহিত রহিয়াছে শর্করা অণুর বন্ধনের রকমফের। ফলে নতুন করোনা ভাইরাসের মিউটেশনের রকমসকম বুঝিয়া উঠা বিজ্ঞানীদের জন্য সহজ নহে। নিওকভের ব্যাপারে চীনের উহানের বিজ্ঞানীরা জানাইয়াছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বাদুড়ে শনাক্তকৃত করোনা ভাইরাসের নতুন প্রজাতি নিওকভের সহিত মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রমের (মার্স) জন্য দায়ী ভাইরাসের সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে।

নিওকভ বুঝিতে হইলে মার্স ও সার্স বুঝিতে হইবে। অনেক পাঠকের এখনো নিশ্চয়ই সার্স ও মার্সের কথা মনে আছে। সিভিয়র অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম ২০০২ সালে চীনের হুবেই হইতে ছড়াইয়া বিশ্বব্যাপী ৮ হাজার মানুষকে আক্রান্ত করিয়াছিল। মৃতু্য হইয়াছিল প্রায় পৌনে ৮০০ জনের। মৃতু্যহার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। অন্যদিকে মিডিল-ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (মার্স) ২০১২ সালে সৌদি আরব হইতে ছড়াইয়াছিল। উটের মাংস, দুধ অথবা উটের পরিচর্যার সহিত যুক্ত মানুষের মাধ্যমে ইহার সংক্রমণ শুরু হইয়াছিল। এই ভাইরাসের ক্ষেত্রে মৃতু্যর হার ছিল ৩৪ শতাংশ। ইতিমধ্যে একটি গবেষণায় বলা হইয়াছে, মার্স করোনা ভাইরাস বাদুড় হইতে উটে আসিতে শুরু করিয়াছিল ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে। উটের দেহ হইতে মানুষের দেহে প্রবেশের প্রস্ত্ততি লইয়াছে ২০০৭ হইতে ২০১২ সাল অবধি। সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে মিউটেশনের হার স্থিতিশীল। নিওকভের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ব্যাপার হইল, এই ভাইরাসের সংক্রমণে প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জনের মৃতু্য হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। তবে ছোট্ট একটি আশার কথা হইল, বাদুড় হইতে মানবদেহে সংক্রমিত হইবার জন্য প্রয়োজনীয় মিউটেশন এখনো এই ভাইরাসের হয় নাই। অর্থাৎ এখনই নিওকভ লইয়া ভয় নাই। তবে তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, মার্স ও সার্স কিন্তু এখন আর নাই। করোনা ভাইরাসের জ্ঞাতি এই দুইটি রোগ কোভিড-১৯-এর মতো সেই সময় সমগ্র বিশ্বে ছড়াইতে পারে নাই।

তবে বিভিন্ন ভাইরাস লইয়া এই মানবসভ্যতা বহুকাল ধরিয়াই ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলিতেছে। মারণ ভাইরাসের হঠাত্ বিস্তারের ঘটনা যখন-তখন ঘটিতে পারে, আবার দশকের পর দশক ধরিয়া বিশেষ কোনো মহামারি নাও আসিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে, ভাইরাস কালো-ধলা, বা ধনী-গরিব চিনে না, শুধু মানুষ চিনে। সুতরাং বিপদ আসিলে সেই বিপদ পুরা মানবজাতির। যাহাই ঘটুক না কেন, তাহা মোকাবিলাও করিতে হইবে সম্মিলিতভাবে।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন