আগে মাতৃভাষার গাঁথুনি, অতঃপর বিদেশি ভাষা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৩০

আজ থেকে আনুমানিক শত বছর আগে রবি ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন।’

এই পঙ্ক্তিগুলোতে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে তাল মেলাতে ইংরেজিকে বাংলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাকে কবিগুরু ভর্ত্সনা করেছিলেন। তদুপরি বাঙালিদের এহেন নির্বুদ্ধিতায় তিনি হয়ে পড়েছিলেন চিন্তাক্লিষ্ট।

আজ এই ২০২২ সালে, কবিগুরু যদি এ প্রজন্মের বাংলিশ আর ন্যাকামো করে বাংলাকে ইংরেজি উচ্চারণে দেখতেন, হয়তো তিনি স্যার আলফ্রেড বার্নাড নোবেলকে পরলোক থেকে তুলে এনে বলতেন, আমাকে এক টুকরো ডিনামাইট দাও, আমি এদেরকে মুখে পুরে দিয়ে বাংলা প্রশিক্ষণ দিই!

বলাই বাহুল্য, বিশ্বে আনুমানিক ২২৮ মিলিয়ন অর্থাত্ প্রায় ২৩ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা বাংলা ভাষাভাষী। বলতে অত্যন্ত গর্ব হয়, বিশ্বে আনুমানিক ৭ হাজার ভাষার মধ্যে মাত্র ২৫টি ভাষায় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এবং এর মধ্যে বাংলা ভাষা একটি! তাহলে আমাদের সমস্যা কোথায়? কেন আমরা নিজেদের এতটা ছোট করি? কেনই-বা বাংলাকে বিকৃতভাবে উপস্হাপন করি?

অন্য কোনো ভাষায় কথা বলাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে না, বরং মাতৃভাষাকে বিকৃত করার প্রবণতা এবং অন্য ভাষাকে জানতে মাতৃভাষার গুরুত্ব বোঝানো হচ্ছে।

পড়াশোনা ও চাকরির বদৌলতে আমি বিগত দুই দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেছি। তাই ভাষার বৈচিত্রে্যর সঙ্গে বেশ পরিচিত। এ ছাড়া আমার বাবা প্রয়াত প্রফেসর মুহাম্মদ নুরুন্নবী ছিলেন একজন বাংলার শিক্ষক, রবীন্দ্র গবেষক এবং ভাষার জাদুকর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ছাত্র। এজন্য পারিবারিকভাবেই বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে কষ্ট হয়নি এবং হয়তো এ কারণেই যে কোনো প্রতিকূল ভাষার পরিবেশেও খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি।

আমাদের মেয়ে উর্ষিতার বয়স চারের কিছু বেশি। ওর জন্ম বেলজিয়ামে, যেখানে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ফরাসি, ডাচ (নেদারল্যান্ডস) ও জার্মান তিনটি ভাষাই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আজ অবধি ওর সঙ্গে আমি বা আমার স্ত্রী কেউ বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলিনি। প্রাসঙ্গিকভাবে বলছি, আমার স্ত্রী (অরিন )-এর বেড়ে ওঠা বেলজিয়ামে এবং ফরাসি ওর দ্বিতীয় ভাষা। সে ফরাসিতেই স্কুল শেষ করে চিকিত্সা বিজ্ঞানে স্নাতক শেষে এখন স্নাতকোত্তর করছে এবং তার পড়াশোনার মাধ্যম হলো ফরাসি ও ইংরেজি। চাইলে সহজেই সে উর্ষিতাকে ফরাসি শেখাতে পারত; কিন্তু আমরা মেয়ের সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্যও বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন মনে করিনি। আমার স্ত্রীর মতে, মায়ের ভাষায় ভাব প্রকাশের এই আনন্দটুকু থেকে কেন আমরা ওকে বঞ্চিত করব বা নিজেরাই-বা কেন বঞ্চিত হব?

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত শিশুরা একের অধিক ভাষা খুব সহজেই শিখতে পারে, যদি তাদের সঠিক পদ্ধতিতে শেখানো হয়। এই পদ্ধতির প্রথম ধাপ হলো, মাতৃভাষার গাঁথুনি। আমার বিশ্বাস, আমাদের মেয়ে বিভিন্ন ভাষার বিড়ম্বনায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে, বাংলাটা শক্তভাবে বলতে পারে এজন্যই।

অনেকে বাংলায় আঞ্চলিকতাকে খাটো করে দেখেন, তাদের দেখে আমার করুণা হয়! আঞ্চলিকতা ভাষার প্রাণ। সবাই নিজের মতো করে ভাব প্রকাশ করবেন, এইখানেই ভাষার মাধুর্য। শুধু সঠিকভাবে বললেই হলো। তা-ই শুদ্ধ বাংলা বলতে গিয়ে নিজেদের অ্যাংলো বানানোর প্রয়োজন নেই। আমরা যে বাংলাটা পারি, সেটাতেই চেষ্টা করি।

অভিবাসী দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে নিজেদের ঘরের পরিবেশেও মাতৃভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষা বলার প্রবণতা লক্ষণীয়। তারা মনে করেন, বাসায় ইংরেজি বা অন্য যে কোনো স্হানীয় ভাষা বললে হয়তো বাচ্চারা সেই ভাষা শিখতে পারবে সহজেই। এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল, কারণ কত জন অভিভাবক সঠিকভাবে স্হানীয় বিদেশি ভাষাটা আয়ত্ত করতে পারে? তর্কের খাতিরে ধরলাম, একজন অনেক ভালো জানে; কিন্তু তার পরও কি তা মাতৃভাষার সমকক্ষ হবে? যে ভাষাটা আমি সবচেয়ে ভালো জানি, সেটাতেই আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকা উচিত এবং আমার সন্তানকে সেটাই প্রথম শেখানো উচিত। দেখবেন যে কোনো বিদেশি আঞ্চলিক ভাষা, আপনার শিশু আপনাআপনি শিখবে এবং নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, তা সঠিকভাবে শিখবে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলাকে তাচ্ছিল্য করে গিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে দক্ষতা দেখাতে। প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি কাব্যগ্রম্হ ক্যাপটিভ লেডি, কিন্তু সুনাম কুড়োতে পারেননি। সেকালের ইংরেজি সাহিত্যিকেরা তাকে বাংলাতে রচনায় মনোযোগ দিতে বলেন। এবং এর পর তিনি বাংলায় একের পর এক সে চমক দিতে থাকেন, হয়ে ওঠেন সেকালের অন্যতম বোহেমিয়ান ও রোমান্টিক কবি।

প্রকারান্েত রবি ঠাকুর বাংলায় সাহিত্য রচনা করে তার ইংরেজি অনুবাদ নিজেই করেন এবং বলাই বাহুল্য পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েক জনের নোবেল লরিয়েটদের মধ্যে রবি ঠাকুর একজন, যিনি কিনা নিজের সাহিত্য নিজেই অনুবাদ করেছেন, নোবেল পুরস্কারটা কিন্তু বাংলা ভাষাতেই পেয়েছেন। এখানেই বাংলাভাষা তথা মাতৃভাষার গাঁথুনির জোর।

এ যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু উদ্ভট বাংলার ব্যবহার দেখা যায়, যেমন—ধরুন, বফ/গফ, যা কিনা ইংরেজির বয় ফ্রেন্ড/গার্ল ফ্রেন্ডের সংক্ষিপ্ত আকার। যদি বাংলায় লেখার থাকে, তাহলে ছেলে বন্ধু অথবা মেয়ে বন্ধু লিখলেই হয় অথবা সুন্দর বাংলা হলো প্রেমিক অথবা প্রেমিকা। প্রেমিক/প্রেমিকা একটি পরিপূর্ণ শব্দ, ইংরেজির মতো নড়ু/মরত্ষ-এর সঙ্গে ভত্রবহফ লাগিয়ে অর্থ তৈরির প্রয়োজন নেই। আমাদের ফেসবুক প্রজন্ম বাংলা ভাষার বিকৃত না করে যদি সঠিক ব্যবহার করত, তাহলে আজকের বাবু খাইছো ধরনের সংগীতের জন্ম হতো না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে কয়টি দেশ আছে, সব কয়টি দেশের দাপ্তরিক ভাষা আছে এবং তার সঠিক ব্যবহার করার যথাযথ পরিবেশ সরকার নিশ্চিত করে। প্রতিটি দেশের কর্মকাণ্ড বা কর্মক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষার যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়, কোনো বিদেশি ভাষা নয়। যে বা যারা স্ব স্ব ভাষায় উচ্চশিক্ষিত, তাদের জন্য অন্য একটি ভাষা আয়ত্ত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তা-ই নিজের ভাষাকে ছোট করে বিদেশি ভাষায় নিজের দাম্ভিকতা দেখানো ও ভাষার বিকৃত করা গর্হিত অপরাধ। পৃথিবীর একমাত্র ভাষা বাংলা, যা কিনা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত! এ ভাষা আমার মায়ের ও আমার নিজের। এ ভাষায় আমি হাসি, কাঁদি, গান গাই! কী করে পারি এর তুলনা করতে? আর যারা এর তুলনা করে, তারা হিংসুটে। তা-ই কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছা করে :

যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়,
নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশে ন যায়?

আসুন, এই ভাষার মাসে প্রতিজ্ঞা করি, ঘরে ঘরে সঠিক বাংলা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলব। মোবাইল ফোন নিয়ে ফেবুতে পড়ে না থেকে অথবা হিন্দি সিরিয়ালের ভলিউম কমিয়ে নিজের বাচ্চার সঙ্গে আজকে ঠাকুরমার ঝুলি পড়ি। দেখবেন কালকে আপনার সন্তান একজন সঠিক মানুষ হয়ে উঠবে, হয়ে উঠবে সত্যিকারের বাঙালি!

আমার বাবা মুহাম্মদ নুরুন্নবী তার নাতি-নাতনিদের উদ্দেশে একটি ছোট কবিতা লিখেছিলেন, তা আমার লেখার সঙ্গে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ! কবিতার প্রথম পংক্তিগুলো-

স্মৃতির মিনার পথ দেখালো
শোকের পরশ পৌঁছে দিলো
চাঁদ ছড়ালো জ্যোছনা রাতে
সূর্য দিনের আলো
দেশটা বড় ভালো!

লেখক: সুইডেন প্রবাসী প্রযুক্তিবিদ 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন