১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু দুই কন্যা ব্যতীত সপরিবারে নিহত হলেন। ১৬ আগস্ট এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিমানবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদ থেকে পদত্যাগ করলেন এবং একই সঙ্গে এয়ার কমোডর খাদেমুল বাশারকে পরবর্তী বিমানবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদের জন্য সুপারিশ করলেন। ১৮ আগস্ট খন্দকার মুশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে মুশতাক এবং অন্যান্য খুনি ফারুক-রশিদদের সঙ্গে বৈঠক করে জেনারেল ওসমানী সাহেব এ কে খন্দকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্হানরত গ্রুপ ক্যাপ্টেন পাকিস্তানপস্থি তাওয়াবকে এয়ার ভাইস মার্শাল পদে পদোন্নতি এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান করে নিয়োগপত্র পাঠান। তাওয়াব সাহেব দুই-তিন দিন পর বাংলাদেশে এসে বিমানবাহিনীর প্রধানরূপে যোগদান করেন। একই সঙ্গে তিনি হন ডেপুটি মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। এভিয়েশন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভারও দেওয়া হলো তাকে।
বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট করার জন্য তখন একখানা বোয়িং-৭০৭ অ্যারোপ্লেন ছিল। বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তাওয়াব সাহেব বললেন, বিমানের জন্য আর একখানা বোয়িং-৭০৭ অ্যারোপ্লেন কেনা উচিত। সে অনুযায়ী তিনি আমেরিকার ‘প্যান এয়ার’ নামের এক কোম্পানির কাছ থেকে অতি পুরোনো এবং অনেক দিন যাবত্ অব্যবহূত অবস্হায় থাকা একখানা বোয়িং-৭০৭ অ্যারোপ্লেন কেনার ব্যবস্হা করলেন। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ঐ অ্যারোপ্লেনখানার দাম নির্ধারিত হলো ২৪ লাখ ডলার। ঐ অ্যারোপ্লেন দেখার জন্য বিমানের প্রকৌশল বিভাগের দুজন ইঞ্জিনিয়ার তাওয়াব সাহেবের সঙ্গী হলেন। ঐ অ্যারোপ্লেন কেনা সঠিক হবে না বলায় বিমানের ইঞ্জিনিয়ারদ্বয়কে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে তাওয়াব সাহেব একক ক্ষমতায় অ্যারোপ্লেনখানার ক্রয়াদেশে স্বাক্ষর করলেন।
ঐ অ্যারোপ্লেন কিনতে বুকিং বাবদ ১০ লাখ ডলার দিতে হলো। বাকি ১৪ লাখ ডলার ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, এমন শর্ত যুক্ত করা হলো। ঐ অ্যারোপ্লেনের যাত্রীবহনের ক্ষমতা ছিল না বলে ‘প্যান এয়ারের’ পাইলটরা অ্যারোপ্লেনখানা ফেরি ফ্লাইট করে ঢাকায় পৌঁছে দিলেন।
ঐ অ্যারোপ্লেন এখানে আনার পর বাংলাদেশে এস-টু আলফা আলফা (ঝ২-অষভধ অষভধ খরসধ) হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা হলো। কিন্তু যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিল না বলে অ্যারোপ্লেনটিকে সিভিল এভিয়েশন কতৃর্পক্ষ এয়ার ওয়ার্দিনেস সার্টিফিকেট দিল না।
তখন বাধ্য হয়ে যাত্রীবহনযোগ্য করার জন্য এটিকে লন্ডনের কাছে স্ট্যান্ডস্টান্ড নামের বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো। ওখানে অঞঊখ নামে অ্যারোপ্লেন মেরামতকারী একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। ঐ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ বিমানের অ্যারোপ্লেনগুলো মেইটেন্যান্স করত।
আলফা আলফা লিমা অ্যারোপ্লেনটি সম্পূর্ণটা মেরামত করতে গিয়ে অঞঊখ জানাল, তাদেরকে মেরামত কাজের জন্য ১ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। ঐ অর্থ পরিশোধ করতে এবং ‘প্যান এয়ারের’ পাওনা ১৪ লাখ ডলার পরিশোধ করার ক্ষমতা তখন বাংলাদেশ বিমানের ছিল না। অর্থ মন্ত্রণালয় তাওয়াবের হাতে ছিল না। তাই মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় করাতেও পারেননি।
বিমানের কর্মকর্তারা মনে করলেন, চেষ্টা করে দেখা যাক, আলফা আলফা লিমা অ্যারোপ্লেনখানার জন্য ১ মিলিয়ন ডলার বুকিং মানি দেওয়া হয়েছে, সে অর্থ ফেরত পাওয়া যায় কি না। বিমানের দুই-তিন জন কর্মকর্তা আমেরিকায় গিয়ে একটি লবিস্ট ফার্মকে এ কাজের জন্য নিয়োজিত করলেন। ঐ লবিস্ট ফার্মের প্রধান ছিলেন একজন প্রভাবশালী সিনেটর। তিনি প্যান এয়ার কতৃর্পক্ষকে বললেন, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশটির আর্থিক অবস্হা ভালো নয়। তাই আপনাদের পাওনা এবং মেইনটেন্যান্সের অর্থ পরিশোধ করতে সক্ষম নয়। আপনাদের যে অগ্রিম ১ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল, সেই অর্থটা ফেরত দিলে দেশটি উপকৃত হবে।
‘প্যান এয়ার’ বলল, আমাদের যে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ৫ লাখ ডলার আমরা পেয়েছি এবং বাকি ৫ লাখ ডলার নিয়েছেন এয়ার ভাইস মার্শাল তাওয়াব। এক মাসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় অঞঊখ থেকে প্যান এয়ার অ্যারোপ্লেনখানা নিয়ে গেল। প্যান এয়ারের লাভ হলো বিমানের খরচে তাদের অ্যারোপ্লেনখানা সুন্দরভাবে মেরামত করিয়ে নিল।
কিছু দিনের মধ্যে দেখা গেল তাওয়াব সাহেব খুব ধার্মিক হয়ে পড়েছেন। তিনি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিরাট একটি ধর্মীয় সভার আয়োজন করলেন। প্রধান অতিথি হলেন তাওয়াব সাহেব নিজেই। ঐ সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখলেন এবং বললেন, দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা না গেলে দেশের কোনো উন্নতি করা যাবে না। তখন তার পকেটে দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করা ৫ লাখ ডলার।
জিয়াউর রহমান তখন চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। খন্দকার মুশতাক দেশের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তখন বঙ্গভবনে ট্যাংকের পাহারায় অবস্হান করছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সমর্থকরা আছেন। কর্নেল তাহেরের সমর্থক বিপ্লবী সৈনিক সংস্হার লোকরাও আছেন। সব মিলিয়ে জিয়াউর রহমান তখন পর্যন্ত নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে পারেননি। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তাওয়াবের মতো উচ্চাভিলাসী খলনায়ক। জিয়াউর রহমান মনে করলেন, আপাতত তাওয়াবের মতো আপদকে তো বিদায় করা যাক।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধর্মীয় মহাসমাবেশের পরের দিন জিয়াউর রহমান একজন মধ্যম সারির অফিসারের নেতৃত্বে কয়েক জন সৈনিককে তাওয়াবের বাসায় পাঠালেন। ঐ সৈনিকরা তাওয়াব সাহেবকে বললেন, ‘আপনার প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নেন। আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে। তাওয়াব সাহেবকে একটা টেলিফোন করারও সুযোগ দেওয়া হলো না।
সেনাবাহিনীর লোকেরা তাওয়াব সাহেবকে নিয়ে বিমানবন্দরে গেলেন এবং একখানা উড়োজাহাজে তুলে দিয়ে জার্মানিতে যাওয়ার টিকিট হাতে দিয়ে বললেন, আপনি যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানেই আবার ফিরে যান। এটা জিয়াউর রহমানের নির্দেশ।
১৯৭৩ বা ’৭৪ সালে তাওয়াব সাহেব আর একবার বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। কোনো এক প্রভাবশালী লোকের সুপারিশক্রমে বঙ্গবন্ধু তাকে বাংলাদেশ বিমানের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেবার তাকে মুক্তিযুদ্ধকালীন তার কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য বঙ্গবন্ধুকে বলে ক্যাপ্টেন শাহাবউদ্দিন এবং আমি তাওয়াবকে ঐ পদ থেকে অপসারণের ব্যবস্হা করেছিলাম।
আমি তাওয়াবকে নিয়ে আর আলোচনা না করে অন্য একটি প্রসঙ্গ নিয়ে সংক্ষেপে দুটো কথা বলছি। দুই হাজার সালের দিকের কথা।
বর্তমানের সিভিল এভিয়েশন বিভাগের চিফ এক্সামিনার ক্যাপ্টেন রফিউল হক তখন বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের ডিরেক্টর। একদিন প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন উচ্চপদস্হ অফিসার ক্যাপ্টেন রফির অফিসে এলেন। তিনি একথা-সেকথা বলার পর বললেন, বিমানের ডিসি-১০ অ্যারোপ্লেনে যেসব আইএনএস (ওঘঝ) যন্ত্র আছে, ওগুলো তো খুব পুরোনো মডেলের। তিনি অর্ধেক মূল্যে সর্বশেষ মডেলের আইএনএস যন্ত্র দিয়ে ওগুলো রিপ্লেস করে দিতে পারেন।
বিমানের তখন চারখানা ডিসি-১০ প্লেনে ১২টা আইএনএস যন্ত্র ছিল। যার মোট মূল্য তখনকার মুদ্রামানে ছিল ২০ কোটি টাকা। তিনি মাত্র ১০ কোটি টাকায় ওগুলো প্রতিস্হাপনের কাজ সম্পন্ন করে দিতে পারবেন।
আইএনএস প্রযুক্তি অ্যারোপ্লেনে সংযোজিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালের দিকে। এর আরো ১০ বছর পরে এর চেয়ে অনেক সস্তা কিন্তু অনেক বেশি নির্ভরশীল ঋঝে (ঋষরমযঃ েঁরফধহপব ঝুংঃবস) অ্যারোপ্লেনে ব্যবহার করা শুরু হলো। এফজিএস সিস্টেম চালু হওয়ার পর সব এয়ারলাইন্স আইএনএস যন্ত্রের প্রতি উত্সাহ হারিয়ে ফেলল। এই অবস্হা বিভিন্ন কোম্পানির উত্পাদিত আইএনএস যন্ত্রগুলো উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের গোডাউনে পড়ে থাকল। ঐ অব্যবহূত আইএনএস যন্ত্রগুলোই প্রতিরক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিমানকে গছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন।
প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তার প্রস্তাবে বিমানের অপারেশন বিভাগের প্রধান সম্মত হলেন না। বরং বুঝিয়ে বললেন, বিমানের প্রয়োজন জিপিএস দিয়ে, বিমানের আইএনএস যন্ত্রগুলোকে রিপ্লেস করা। ক্যাপ্টেন রফির জবাব শুনে প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা বললেন, জিপিএস সম্পর্কে তার বেশ ভালো ধারণা আছে। ওগুলো খুব সস্তা প্রযুক্তি। বিদেশে সাধারণ মানের গাড়িতেও ঐ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তার জানা ছিল না যে, অ্যারোপ্লেনের জিপিএস এবং গাড়িতে ব্যবহার করা জিপিএসের মধ্যে পার্থক্য কী এবং কতটা? এই বিদ্যা নিয়ে তিনি বিমানের অভিজ্ঞতায় এবং সবচেয়ে শিক্ষিত পাইলটদের অন্যতম পাইলটকে জিপিএস যন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে চেষ্টা করছেন!
ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের প্রধান, ক্যাপ্টেন রফিউল হককে তিনি বললেন, আপনাদের মন্ত্রী মহোদয়, মন্ত্রণালয়ের সচিব, নতুন আইএনএস যন্ত্রগুলো কেনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। কেবল বিমানের এমডি সাহেব বলেছেন, আপনার কাছ থেকে লিখিতভাবে ইতিবাচক বক্তব্য থাকা উচিত।
ক্যাপ্টেন রফি মনে করলেন, এই অহংকারী ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক করা শুধু সময়ের অপব্যবহার করা হবে। তাই তাকে একবার চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করার পরেও আবার জানতে চাইলেন, আপনাকে কি আর একবার চা-কফি দিতে বলব?
প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রফিকে বললেন, আজ আপনি টেবিলের বিপরীত দিকে বসে আছেন। আমিও একদিন টেবিলের অপর দিকেই বসতাম।
শেষ পর্যন্ত বিমানের এমডি এবং অপারেশন বিভাগের প্রধানকে বাদ দিয়ে মন্ত্রী ও সচিবের সহায়তায় তিনি অপ্রয়োজনীয় আইএনএস যন্ত্রগুলো বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরে বিমানের এমডির অফিসে ক্যাপ্টেন রফির সঙ্গে আলোচ্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তার দেখা হয়েছিল। ক্যাপ্টেন রফিকে দেখে ঐ কর্মকর্তা শুধু তির্যকভাবে একটু হেসে ছিলেন। ক্যাপ্টেন রফি আমাকে বলেছিলেন, আলোচ্য কর্মকর্তার তির্যক হাসি দেখে নিজেকে সেদিন খুব অসহায় মনে হয়েছিল।
লেখক: বীরপ্রতীক, বৈমানিক কিলো ফ্লাইট
