পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখিলে দেখা যায়, সরকারি বিভিন্ন ছোট ছোট কাজ হইতে শুরু করিয়া মাঝারি এবং বড় বড় প্রকল্পের কাজ বন্ধ হইয়া আছে অথবা অতি মন্থর গতিতে চলিতেছে। ক্ষেত্রবিশেষে ছোট ছোট অনেক কাজ হারাইয়াও যায়। ভাবিতে গেলেও শিউরাইয়া উঠিতে হয়, যেই সকল ছোট ছোট কাজ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করিবার বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে, তাহা চার-পাঁচ বৎসরেও শেষ হয় না। ইহাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের যে ভোগান্তি বাড়িয়া যায় তাহা বলাই বাহুল্য। অথচ এই সকল কাজের জন্য যেই সকল ঠিকাদারকে টেন্ডার দেওয়া হয় তাহাদের লাইসেন্স বাতিলসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না বলিলেই চলে। এই সকল মাঝারি ও বড় বড় প্রকল্পে স্থবিরতা এবং বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে খরচও বাড়িয়া যায় অতি মাত্রায়। ইহা যে সরকারের অর্থের অপচয়, তাহা যেন ভাবিয়া দেখারও কেহ নাই!
আমরা দেখিতে পাই—সরকারি বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রাখা হইতে শুরু করিয়া ইহার পিছনে ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি—এই বিষয়গুলি বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। ইহার পিছনে যেই সকল সিন্ডিকেট রহিয়াছে তাহাদের কথা সকলেই জানে; তাহার পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। আমরা বুঝিতে পারি, সিস্টেম কাজ করিতেছে না। আবার সরকারি বড় বড় প্রকল্পে দেশীয় পরামর্শকের পাশাপাশি বিদেশি পরামর্শক থাকিবার পরও সেইখানেও আমরা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্পব্যয় বাড়িয়া যাওয়ার বিষয়টি দেখিয়া থাকি। বুঝিতে কোনোই অসুবিধা নাই যে, এই দীর্ঘসূত্রতাকে সংশ্লিষ্ট কেহ কেহ অর্থ উপার্জনের পথ হিসাবে বাছিয়া লইয়াছেন। অর্থ উপার্জন করা যদি এতটাই সহজ হইয়া থাকে তাহা হইলে শ্রম দিয়া, নিয়মকানুনের মধ্যে থাকিয়া অর্থ উপার্জন করার কী প্রয়োজন? উন্নয়নশীল বিশ্বে যখন সরকার পরিবর্তন ঘটে তখন ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের অপচয়, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘসূত্রতার হাজারো ফিরিস্তি উঠিয়া আসে। কিছুদিন পর আবার যাহা—তাহাই, সকল কিছুই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া যায়। দুই-একটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে কাহাকে শাস্তি প্রদান করা হইলেও এবং আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হইবার পরও বিভিন্ন অজুহাত তুলিয়া তাহার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দাবি করা হয়। আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান হইলেও বাস্তব জীবনে আমরা তাহার প্রতিফলন ঘটিতে দেখি না।
দেখা যায়, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, মেয়াদ ও ব্যয়বৃদ্ধির কারণে ১০ হইতে ১৫ বৎসরে সরকারের যে অপচয় হয়, তাহার আকার দেশের এক অর্থবৎসরের বাজেটের সমান। কোথায় অপচয় নাই, সর্বনিম্ন পর্যায় হইতে শুরু করিয়া সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ কাজ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপচয়। ইহার ফলে সরকারের দেশব্যাপী উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের সুফলের পরিবর্তে সরকারপ্রধানকে সমালোচনার সম্মুখীন হইতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আঙুল তোলা হয় সরকারপ্রধানের দিকে। উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা দেশ পরিচালনা করিয়া থাকেন তাহারা যেই হারকুলিয়ান টাস্ক করিয়া থাকেন তাহা সহজেই অনুমেয়; ক্ষেত্রবিশেষে তাহারা জীবনও দিয়া থাকেন। ইহার প্রধান কারণ—সকল অপকর্মের দায় তাহাকেই লইতে হয়। সরকারপ্রধানকেই যদি সকল কিছু দেখিতে হইবে, তাহা হইলে বিভিন্ন বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর রহিয়াছে কেন? কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাহার শাসনামলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজে হতাশা প্রকাশ করিয়া লিখিয়াছেন, আই অ্যালোন ক্যান ডু ইট।
দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫০ বৎসর হইয়াছে। আর কত? সরকারি কাজ দেখভাল করিবার জন্য যেই সকল বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর রহিয়াছে তাহাদের প্রতিটি ছোট, বড় ও মাঝারি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব লইবার জন্য তত্পর হইতে হইবে। ইহার পাশাপাশি প্রশাসনকেও কঠোর হইতে হইবে; যেই সকল ঠিকাদার কাজ ফালাইয়া রাখিয়া রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় করিয়া থাকেন তাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, অপকর্মকারীদের সহিত প্রেম-ভালোবাসা আর সঠিক প্রশাসন একত্রে চলিতে পারে না।
