ডিসেম্বর ক্লোজিং সম্পন্ন হয়নি অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:০০

দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে ডিসেম্বর ক্লোজিং করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ বিশেষায়িত বেশকিছু ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সময় বাড়িয়ে নিলেও তথ্য প্রযুক্তির ত্রুটির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ব্যাংক এখন প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হিসাবনিকাশ করছে। সোনালী ব্যাংক গত ডিসেম্বর শেষের বার্ষিক হিসাব সম্পন্ন করতে পেরেছে গত ৩১ জানুয়ারি ২০২২। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, রাষ্ট্রয়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে জবাবদিহিতার অভাব, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতিতে অভিযুক্তরা স্থান পাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে এমন ব্যক্তিও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ফলে, নিচের দিকেও জবাবদিহিতার চাপ তৈরি হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, ক্যালেন্ডার ইয়ার (পঞ্জিকা বছর) অনুযায়ী ব্যাংকের হিসাবনিকাশ করা হয়। বছরের শুরু অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর আয়-ব্যয়ও হিসাব হয়। সাধারণত এ হিসাব একই বছরের ডিসেম্বর মাস বা পরের বছরের জানুয়ারি প্রথম দিকে শেষ হয়। আর এ হিসাব শেষ করাকে ব্যাংক ক্লোজিং বলা হয়। এটা অবশ্য বার্ষিক অনিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব। এ হিসাবের মাধ্যমেই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হিসাব করা হয়। পরে তা নিরীক্ষা করা হয় এবং পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) এবং সরকারকে কর প্রদান করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফার পরে একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা পাওয়া যায়।

ব্যাংকিং খাতে তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজন সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বিষয় হলেও যথাযথ তদারকির অভাব থাকায় ব্যাংকগুলোতে ইচ্ছেমাফিক সফ্টওয়্যার ব্যবহার, আপগ্রেড না করা, গুরুত্ব না দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ব্যাংক তথ্য ঘষামাজার কাজটিও করে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

ব্যাংক ক্লোজিং না হলে ব্যবসা পরিচালনা, আয়-ব্যয় ও মুনাফার প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। সারা দেশের মাঠ পর্যায় থেকে আসা তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে আর্থিক হিসাব চূড়ান্ত করা হয়। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই নতুন বছরের কয়েক দিন লেগে যায়। কিন্তু এবারে ব্যতিক্রম যে, তথ্যপ্রযুক্তির ত্রুটির কারণে বিলম্ব হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারও আপগ্রেড করা হয়নি। ব্যাংকিং খাতের তথ্যপ্রযুক্তি সংযোজন কাজেও অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য এখন স্বাভাবিক বিষয়। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কিংবা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে প্রযুক্তি স্হাপন এই অবস্হায় এনে দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও সফটওয়্যার-কেন্দ্রিক নানা জটিলতার বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু তাতে গ্রাহ্য কম। বরং এক ধরনের যোগসাজশ চলছে ব্যাংকগুলোতে। শুধু ঋণ বিতরণে অনিয়ম নয়, ব্যাংক পরিচালনার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় উপকরণ ক্রয়েও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।

সূত্রমতে, ব্যাংকিং খাতে সফটওয়্যার জালিয়াতির কারণে গ্রাহকরাও ঝুঁকিতে থাকছে। গ্রাহকের তথ্য চুরি, লেনদেনের ঝুঁকি, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের হিসাবে গরমিল দেখা দিতে পারে। সর্বোপরি গ্রাহক স্বার্থ বিপন্ন হতে পারে। ইতিমধ্যে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি থেকে শুরু করে হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ওপর পরিচালিত এক তদন্তে সফটওয়্যার আপগ্রেড না করে ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও উদ্ঘাটিত হয়েছে। তথাপি কোনো প্রতিকার হয়নি। মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, এখানকার অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তা ঝঁকিতে রয়েছে। কিন্তু কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশেষায়িত বেসিক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও রূপালী ব্যাংকেও কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার নিয়ে নানা কথা চাউর রয়েছে। যা ব্যাংক ক্লোজিং না হওয়ায় আরো বেশি আলোচনায় আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পদে একাধিক মেয়াদি চুক্তি, দুদকের মামলা থাকার পরও চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি, ব্যাংকে চাকরির নির্ধারিত বয়স ৬৫ পার হওয়ার পর একই পদে বহাল থাকতে সক্ষম হওয়ায় ‘চেইন অব কমান্ডে’রও ব্যত্যয় ঘটছে।

 

ইত্তেফাক/ইউবি