পুষ্টিখাতে মনোযোগ বাড়াতে হবে

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৯

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খাদ্য ও স্বাস্থ্য। এই দুটি মৌলিক চাহিদার সঙ্গেই পুষ্টির সম্পর্ক প্রবলভাবে  জড়িত। কয়েক দশক পূর্বেও বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধিত জনগোষ্ঠির জন্য যেখানে খাদ্য চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হতো সেখানে কৃষিবিজ্ঞানের বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য সংকটের প্রবল আশঙ্কা অনেকাংশেই কাটিয়ে গেছে। কিন্তু এর পরেও দরিদ্রতা আর নানা বৈশ্বিক সংকটের কারণে ক্ষুধা সূচকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২.৯ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করছে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের এ হার ২৬.১ শতাংশ। যথাযথ পুষ্টিকে বলা হয় একটি দেশের মানব উন্নয়ন সূচকের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানব উন্নয়ন অবদান রাখে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নে। যথাযথ পুষ্টি ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। রিটার্ন অফ ইনভেস্টমেন্টের উপর কোপেনহেগেন কনসেনশাস অনুযায়ী অপুষ্টিতে ভোগা একটি জাতি তিনভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়। সরাসরি রাষ্ট্রীয় নাগরিকদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, অপরিপূর্ণ মেধা বিকাশ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীর পরিমাণ হ্রাস এবং নানাবিধ রোগের কারণে স্বাস্থ্যবিল বাড়া।

অপুষ্টি জীবনব্যাপী চলমান এক আবদ্ধ চক্রের ন্যায় কাজ করে। অপুষ্টির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশুরা। শিশুদের স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান পুষ্টিসূচক পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইউএসআইডি’র তথ্যমতে বাংলাদেশে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুদের শতকরা ৩৬ শতাংশ খর্বতায় এবং শতকরা ৩৩ শতাংশ শিশু ঊনতায় ভোগে। খর্বতা মানে বয়সের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ লম্বা না হওয়া এবং ঊনতা মানে উচ্চতার তুলনায় পর্যাপ্ত ওজন প্রাপ্ত না হওয়া। ঊনতাকে স্বল্পমেয়াদী অপুষ্টি সূচক বলা হলেও খর্বতাকে দীর্ঘমেয়াদী সূচক বলে ধরা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশে ৩.১ শতাংশ শিশু মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে (Severe Acute Malnutrition) ভুগছে। প্রজননক্ষম প্রতি ৮ জন নারীর ১ জন অপুষ্টিতে ভুগছে। পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, কৃশতা, মাইক্রোনিউট্রেন্ট যেমন আয়রন, জিংক, ফলিক এসিড, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি১২, আয়োডিন প্রভৃতি ঘাটতিকেও পুষ্টি পরিমাপক সূচক বলে ধরে নেয়া হয়। এসব সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়।

শিশুর উচ্চতার সঙ্গে দেশের উত্পাদনশীলতার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গবেষণায় দেখা যায় শিশুর ১ শতাংশ উচ্চতা হ্রাস ১.৪ শতাংশ উত্পাদনশীলতা হ্রাস করে দেয়। ঊনতায় আক্রান্ত প্রতি শিশুর পেছনে গড়ে ৫৪০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ চিকিত্সার পেছনে ব্যবহার করতে হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব শুধু শিশুকে খর্ব আর ঊন করে তোলে না বরং অন্ধত্ব, মানসিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি শিশুকে পুরোপুরি শারীরিক অক্ষমতার দিকেও ঠেলে দেয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ঊনতা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশুমৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মের পেছনে ঊনতাকে এককভাবে দায়ী করা হয়। সামান্য পরিমাণ ঊন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তার বয়সী আরেকটি স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় দ্বিগুণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ভিটামিন এ ঘাটতির কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু পরিপূর্ণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে জন্ম নেয় না। যার কারণে বিবিধ রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কয়েকগুণে বেড়ে যায়। আয়োডিন ঘাটতির কারণে ১৮ মিলিয়ন শিশু পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ লাভ করতে পারে না। আয়রনজনিত রক্তস্বল্পতায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৬০০০০ তরুণী মাকে মৃত্যুবরণ করতে হয় সন্তান জন্মদান করতে গিয়ে।

অপুষ্টি মূলত কয়েকটি নিয়ামকের সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে দারিদ্র্য, অপর্যাপ্ত খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কায়িক শ্রম, উচ্চ জন্মহার, শিক্ষা গ্রহণে অনীহা অন্যতম। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এদের প্রায় প্রতিটি নিয়ামক চক্রাকারে একে অন্যের সাথে জড়িত। এই চক্র ভাঙতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পুষ্টি শিক্ষা। কৃষিতে উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার আর বিনিয়োগের দরুন বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা ক্রমশ কমলেও নানা কারণে খাদ্য অপচয় আর খাদ্যের যথাযথ উপায়ে ব্যবহার করার অভাবে অপুষ্টির হার প্রত্যাশিত হারে কমছে না।

মনে রাখতে হবে পুষ্টি রাষ্ট্রীয় সংবিধান অনুযায়ী সকলের মৌলিক মানবাধিকার। একটি শিশু যে পরিবার বা রাষ্ট্রের যে প্রান্তেই জন্মাক না কেন লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই সমান অধিকার রয়েছে নিজেকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার। অপুষ্টির ছোবল বাংলাদেশের বিশাল অংশের শিশুদের সেই সুযোগের হাতছানিকে অঙ্কুরে বিনাশ করে দিচ্ছে এবং পাশাপাশি রাষ্ট্রও আর্থিক উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অপুষ্টিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুষ্টিখাতে সরকারের অধিকতর মনোযোগের বিকল্প নেই।

n লেখক:শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়