বইমেলা, বইপাঠ ও বাংলাভাষায় উচ্চশিক্ষা

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:০১

আমাদের সময়ের বইমেলা মানে  তো বাংলা একাডেমির এক চিলতে সবুজ মাঠ। মাঠের পাশে বটতলায় দুই সারি স্টল। পরে মাঠ ও পুকুরপাড় ঘিরে বইমেলা শুরু হলো। এখন যেখানে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর, সেখানে খাবারের দোকান বসতো। কবি-লেখকদের আড্ডা বসতো। পাঠকরা অটোগ্রাফ নিতো। চা-ফুচকা-সিংগাড়া; ডিমভাজি  দিয়ে গরম গরম পরটার স্বাদ জিহ্বায় লেগে আছে। এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুরাটা জুড়েই বইমেলা হচ্ছে। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বইমেলা। এই মেলা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত করার ক্ষেত্রে বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বইমেলা আমাকে সবসময়ই টানে। বইমেলা মানেই তো নবান্নের পিঠাপুলি-পায়েসের মতো নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। প্রাণের স্পন্দন। সেইসঙ্গে তারণ্যের মেলা। তাই মেলা আমাকে ভীষণভাবে টানে। মেলায় এলে কবি-লেখক  -সাংবাদিক রাজপথের বন্ধুদের দেখে, তাদের নতুন বই দেখে মুগ্ধ হই, আপ্লুত হই। মেলার নতুন বইয়ের গন্ধ, কোলাহল আমাকে আনন্দ দেয়। আমার কাছে মেলা মানেই সম্ভাবনা। মেলা মানেই বাঙালি সংস্কৃতির স্ফূরণ।

১৯৮৩  সালে  আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একজন  রাজনৈতিক নেতার মেনিফেস্টো’ প্রকাশিত হয়। সে সময় আমরা বন্ধুরা মিলে পুকুরপাড়ে ওই সবুজ মাঠের এককোণে টেবিল-চেয়ার নিয়ে বই বিক্রি করতে বসতাম। কেবল কী বই বিক্রি করতাম! জমিয়ে আড্ডা দিতাম। দুপুর গড়াতেই মেলায় আসতাম, মেলা শেষ করে রাতে ফিরতাম। তারপর বইমেলা আর কবিতা জাতীয় কবিতা উত্সব একাকার হলো। প্রতিবাদী কবিতার হাজার হাজার উত্তেজিত শ্রোতা। নব্বইর দশকজুড়ে মেলাটা ছিল সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের   প্রাণকেন্দ্র্র।  সে  সময় মেলায়   কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীরা একত্রিত হয়ে সভা-সমাবেশও করতেন। সে এক সংগ্রামমুখর সময়!

আমাদের সময়ে বইমেলায় মানুষের আনাগোনা ছিল কম। কিন্তু আমরা একে অন্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ছিলাম। ওই সময়টায় একটা গ্রামীণ আবহ ছিল। এখন অবশ্য আগের মতো অন্তরঙ্গ জায়গা নেই। সবখানেই নিছক আনুষ্ঠানিকতা, কৃত্রিমতা। এখন কোলাহল বেড়েছে, স্টল বেড়েছে কয়েকগুণ, সেই সঙ্গে পরিসর বেড়েছে, মানুষও বেড়েছে শতগুণ। কিন্তু সেই প্রাণের স্পন্দন, সেই গ্রামীণ আবহ আর খুঁজে পাই না। তবু বইমেলা তো  বইমেলাই।   এখানে প্রাণের কোলাহল না  থাকলে তো চলবে না।  এ কোলাহল তো অন্য কোলাহলের চেয়ে ভিন্ন। প্রাণের একটা যোগ আছে।

এবার জার্নিম্যান বুক্স থেকে আমার দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘সোশ্যাল   সার্ভিস   অ্যাকটিভিটিস   অব   রিলিজিয়াস ইনস্টিটিউশন্স ইন বাংলাদেশ’ ও ‘আমি তোমাদের কবি’। আর, মাওলা ব্রাদার্স  থেকে  আমার ‘প্রেমের   কবিতা’র  দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে এবারের বইমেলায়। এখন বইকেনার ও পড়ার চেয়ে ফেসবুক- সেলফি বেশি। ছবি তোলা সহজ হওয়ায় চিন্তন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বই কেনা ও পাঠ দিয়েই এটা রোধ করতে হবে।

একুশের শহীদ সালাম রফিক জব্বার ও বরকতরা যেভাবে সম্মানিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন সেভাবে পৃথিবীর আর কোনো শহীদের মর্যাদা আমরা দেখি না। ভাষার জন্য শহীদের রক্ত ও জীবনদান বৃথা যায়নি। তাদের রক্তের ধারা বেয়ে আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একাত্তরের রক্তসিক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ— আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বাংলাকে, আমাদের মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করেন। পঁচাত্তরে জাতির পিতার  নির্মম  হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাঙালির সকল অর্জনের  মতো বাংলা ভাষাও নির্মমতার  শিকার  হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় লিখতে বলেছেন এবারের একুশের অনুষ্ঠান থেকে, সেটাও নিঃসন্দেহে হবে।

তবে, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে এবং বিষয়ে বাংলা ভাষায় পাঠদান অপরিহার্য। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার ইতোমধ্যে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান শুরু করেছে। এ এক আনন্দের সংবাদ। উচ্চশিক্ষায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, চিকিত্সাবিজ্ঞান, কারিগরি-প্রকৌশল শাস্ত্র, ইতিহাস, দর্শন, সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষায় তৈরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার ভাষানীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং অনুবাদ সংস্থা গড়ে তোলা একান্ত জরুরি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং বাংলা একাডেমিকে এ কাজ ব্যাপকভাবে করতে হবে। ইতালি, ফ্রান্স, জাপান, চীনসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে এগিয়ে যাচ্ছে।   আমাদের   দেশেও   বাংলা  ভাষার   সমৃদ্ধির সঙ্গে   রাষ্ট্রের শক্তিশালী হওয়া গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমাদের যার যার জায়গা থেকে

এ বিষয়ে কাজ করা আবশ্যক।

লেখক: উপ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, জাতীয় কবিতা পরিষদ