চট্টগ্রামে বেড়েছে জীবনযাত্রা ব্যয়

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৪, ০০:২০

চট্টগ্রামে মাছ, শাকসবজি, তরিতরকারির উচ্চমূল্য এবং রিকশা, সিএনজি অটোরিকশার লাগামহীন ভাড়ার টাকা গুণতে গিয়ে সাধারণ আয়ের মানুষের অবস্থা বেহাল। মাসিক ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় কিছুতেই হচ্ছে না। তার উপর রয়েছে অতিরিক্ত বাড়ি ভাড়া, মাসিক জ্বালানি ও বিদ্যুত্ খরচ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ। আরো আছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বিপুল অংকের চিকিত্সা খরচ। আয়-ব্যয়ের দূরত্ব কমাতে বহু চাকরিজীবী অফিস ছুটির পর প্রাইভেট টিউশনি করছে। বহু পরিবারের গৃহকর্তা এবং তাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানরাও সংসারের চাকাকে সচল-সক্ষম রাখতে প্রাইভেট টিউশনি করছে। আবার কোনো কোনো পরিবারের বধূ-কন্যারা সেলাই-ফোঁড়ের কাজ, ঘরে তৈরি আচার, পিঠা, কাঁচা সমুচা, ইত্যাদি বানিয়ে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করে পরিবারের আর্থিক ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা চালাচ্ছে।

ভুক্তভোগী লোকজন জানান, নগরীর কেন্দ্রে এবং আশপাশে বাড়ি ভাড়া এমন হারে বেড়েছে যে, ইদানিং তারা যৌথভাবে দুই-তিনটি পরিবার মিলে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছে। তাদের মতে নগরীতে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমশঃ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে কোনো পরিবার একজনের আয়ের উপর নির্ভর করে চলতেই পারছে না। ফলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের টিউশনি কিংবা খন্ডকালীন চাকরির সন্ধানে নামতে হচ্ছে।
নগরীতে ব্যাটারি চালিত রিকশার ভাড়া অনেক বেড়েছে। সামান্য দূরত্বও চালকরা ৩০ টাকার কমে যেতে চায় না। প্যাডেলচালিত রিকশা চালকেরাও সামান্য দূরত্ব ২০ টাকার কমে যেতে চায় না। সাধারণ দূরত্বের জন্য তারা ৩০/৪০ টাকা ভাড়া হাঁকায়।
সিএনজি চালিত অটোরিকশাতে উঠলেই যাত্রীদেরকে কমপক্ষে ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। সাধারণ দূরত্বের জন্য অটোরিক্সা চালকরা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে ২৫০ টাকা হারে ভাড়া চাইছে। মহানগরী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেতে ৬/৭ মাস আগেও যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া দিতে হতো সেখানে বর্তমানে ভাড়া গুণতে হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এগুলোর পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন রুটে বাস-মিনিবাস চালু থাকলেও নগরীর বিপুল পরিমাণ যাত্রীর তুলনায় এসব পরিবহনে প্রায়শঃ যাত্রী সংকুলান হয় না। ফলে বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত যাত্রী সময়মতো বাসে উঠতে পারেন না। খালি বাসের অপেক্ষায় তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। চট্টগ্রাম মহানগরীর সিএনজি চালিত অটোরিকশাগুলোতে ভাড়ার হিসাব রাখতে মিটার লাগাতে পুলিশের নির্দেশ থাকলেও এ নির্দেশ পালন করে না চালকরা।
কাঁচা বাজারে মাছ, শাকসবজি, তরিতরকারির দাম গত এক বছর ধরেই আকাশ ছোঁয়া। ঈদুল আযহা উদ্যাপিত হওয়ার পর এক সপ্তাহ কেটে গেলেও সরবরাহ কম এই দোহাই দিয়ে এসব কাঁচা পণ্যের দাম বাড়িয়েই রাখা হচ্ছে বলে ভোক্তা সাধারণের অভিযোগ। বহদ্দারহাট, চকবাজার, ষোলশহর কর্ণফুলী সুপার মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এসব বাজারে সাধারণ সাইজের রুই-কাতলের দাম প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মলাঢেলা মাছই প্রতি কেজি ৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। সামুদ্রিক পোয়া মাছ আকার আকৃতি ভেদে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা। অথচ এসব মাছ এক বছর আগে ১৫০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে। কুচো চিংড়ি বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। মানুষের সামর্থ্য নাই জেনে বিক্রেতারা হাঁকছে, ‘নিয়ে জান এক পোয়া একশ টাকা।’ বড় চিংড়ির কেজি ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা। তুলনামূলকভাবে ফার্মের মোরগ-মুরগির দাম কম থাকলেও কোরবানির পর মানুষ মোরগের গোশত খেতে চাইছে না। কেচকি মাছের প্রতি কেজি ২৫০ টাকা এবং সামুদ্রিক লইট্টা মাছের কেজি ১৫০ টাকা হাঁকছে বিক্রেতারা। ফলে ক্রেতাদের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরোবার জোগাড় হয়েছে।
শাক-সবজির বাজারে ৬০/৭০ টাকার নিচে পটল, লাউ, ঢেঁড়শ, ঝিঙে কিছু মিলছে না। টমেটোর কেজি ১০০ টাকা। ছোট নতুন ফুলকপি বাজারে দেখা যাচ্ছে, তারও প্রতি কেজির দাম ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। নতুন বিচিবিহীন শিম যেগুলো এখন উঠছে সেগুলোর প্রতি কেজি ঠেলাওয়ালারা বিক্রি করছে ১৩০ টাকায়। গাজর প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। এক আঁটি লালশাকের দামও এখন ২৫/৩০ টাকা।
নগরীর সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সা খরচও এখন বেড়ে আকাশচুম্বি। বিভিন্ন চিকিত্সকের চেম্বারে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার নীচে কোনো ভিজিট ফি নেই। অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের ইত্যাদির দামও বাড়তি। অবশ্য কিছু ওষুধের দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। নগরীতে আবার বিরাজ করছে নকল ওষুধের আতংক। সমপ্রতি দুয়েকটি নকল ওষুধের কারখানা র্যাব-পুলিশ শনাক্ত করে সিলগালাও করে দিয়েছে।

নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট বিরাজ করায় বোতলজাত পানি কিনে খেতে গিয়েও সাধারণ মানুষের আয়ের বিরাট অংক চলে যাচ্ছে। ওয়াসা সরবরাহকৃত পানি নগরীর ৪০ লক্ষ মানুষের মধ্যে পাচ্ছে মাত্র ৩৩ শতাংশ। অন্যদেরকে নলকূপের পানি পাম্প ও বিদ্যুত্ খাতে টাকা খরচ করে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় অনেক পরিবার বাজার থেকে বোতলজাত পানি প্রতি দুই লিটারের একটি বোতল ৩০ টাকায় কিনছে। অথচ ঐসব পরিবারে প্রতিদিনই লাগে ৭ থেকে ৮ বোতল পানি। কোনো পরিবার ওয়াসার পানি সিদ্ধ করে জীবাণুমুক্ত করে খাওয়ার চেষ্টা করছে। পানি সিদ্ধ করতেও জনগণকে জ্বালানি খরচ করতে হয়। প্রতি পদে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বৃদ্ধির মুখে বহু পরিবারের তরুণ সদস্যদেরকে কম্পিউটার আউট সোর্সিংয়ে নামতে দেখা গেছে। তরুণরা জানায়, এই খাতের আয়ও অনিশ্চয়তা রয়েছে।