সব গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে কেন্দ্রস্থল জাতীয় প্রেসক্লাব। সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষায় প্রেস ক্লাবের ভূমিকা অনন্য। অথচ সাংবাদিকদের লেজুড়বৃত্তির কারণে একদিন প্রেসক্লাব ভাঙ্গবেই। এটা কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর প্রেসক্লাব ভাঙ্গলে সাংবাদিকদেরও অস্তিত্ব থাকবে না। যেভাবে ইউনিয়ন দুই ভাগ হওয়ায় সাংবাদিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রেসক্লাবের হীরক জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এ সব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও জাতীয় প্রেসক্লাব’ শীর্ষক এই সেমিনারে আয়োজন করা হয়। সেমিনারের শুরুতেই ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সত্যিকার সাংবাদিকতার উন্নয়ন করতে চাইলে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি না করে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে এবং সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করতে হবে। সাংবাদিক ইউনিয়নেরও বিভাজন হয়েছে। কিন্তু এই জাতীয় প্রেসক্লাব যেন বিভাজন না হয় সেই আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনক হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ। সঞ্চালক ছিলেন সেমিনার উপকমিটির আহ্বায়ক পারভিন সুলতানা মুসা ঝুমা। অনুষ্ঠানে প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিকতা বিষয়ে বক্তব্য দেন রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ কামাল উদ্দিন, এ এস এম হাবিবুল্লাহ, আবদুর রহিম, সালেহ চৌধুরী, শওকত মাহমুদ, শফিকুর রহমান, স্বপন কুমার সাহা, আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, আবদুল জলিল ভূঁইয়া, আবদুস শহিদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ক্লাবের আজীবন সদস্য হাসানুজ্জামান খান, এ এস এম হাবিবুল্লআহ, সৈয়দ কামালউদ্দিন, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, শফিকুর রহমান, শওকত মাহমুদ, স্বপন কুমার সাহা ও সৈয়দ আবদাল আহমেদকে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু অনুষ্ঠান শেষে যোগদান করেন এবং সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে সহসভাপতি বখতিয়ার রাণা, যুগ্ম সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নূরুল হাসান খান, শামসুদ্দিন আহমেদ চারু, মাঈনুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বিগত ৬০ বছরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ২৭ জন প্রখ্যাত সাংবাদিক। এদের মধ্যে এমন কয়েকজন দিকপাল সাংবাদিক রয়েছেন, যাদের অতুলনীয় অবদানের কারণে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ এ পর্যায়ে এসেছে।
এ এস এম হাবিবুল্লাহ বলেন, সাংবাদিক বা সম্পাদক হলেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হতে হবে— এমন কোনো কথা নেই। বড় বিষয়টি হলো— আমরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। আগেও রাজনীতি ছিল তবে বিভেদ ছিল না। আর রাজনীতির কারণ যদি প্রেসক্লাবের সদস্যপদ আটকে রাখা হয়, তবে তা কারো জন্য সুখকর নয়। দিল্লি ও পাকিস্তানের প্রেসক্লাবের চেয়ে আমাদের প্রেসক্লাব অনেক উন্নত। তাদের চেয়ে আমাদের কার্যক্রম অনেক বেশি।
সৈয়দ কামাল উদ্দিন বলেন, সাংবাদিকদের উত্কর্ষের জন্য আজ পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাব কোনো ভূমিকা রাখেনি। অথচ অনুষ্ঠানের জন্য অনুদান সংগ্রহ করা হয়। সাংবাদিকদের উত্কর্ষ সাধনে প্রতিমাসে একটি করে সেমিনার হতে পারে। প্রয়োজনে বিদেশি গণমাধ্যমকর্মী এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী বলেন, ক্লাবের অবদান যদি কিছু থাকে তা ছিল পাকিস্তান আমলে। এখন এটা মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আগে প্রবীণ সাংবাদিকদের আলোচনার প্রভাব পেশায় পড়ত, এখন প্রবীণেরাও ক্লাবে আসেন না।
স্বপন কুমার সাহা বলেন, সাংবাদিকতায় জীবন পার হয়ে গেলেও অনেকে সদস্যপদ পাচ্ছেন না। সাংবাদিকতা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা, ক্লাবে এলে তা বিকশিত হবে এবং তরুণদের সেই সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, সাংবাদিকদের রুটি-রুজি আদায়ে জাতীয় প্রেসক্লাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না। গত ১০-১২ বছর ধরে নতুন সদস্যপদ দেয়া হচ্ছে না। কারণ, সদস্যপদ দেয়ার আগে ভোটের চিন্তা করা হয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে জাতীয় প্রেসক্লাব তার ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। প্রেসক্লাব এখন সাংবাদিকদের জায়গা নয়। এ অবস্থায় দাবি ও আওয়াজ উঠেছে ক্লাব ভেঙে দেয়ার। এই ক্লাব ভাঙবে, ভাঙবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না।’
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইউনিয়ন ভাঙ্গায় সাংবাদিকদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। প্রেসক্লাব ভাঙলে সাংবাদিকদের আর অস্তিত্ব থাকবে না। অতীতে আমরা বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেছি প্রেসক্লাবকে ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করে। প্রেসক্লাব হচ্ছে বহুমতের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখন দুটি রাজনৈতিক দলের মদদ পাওয়ার চেষ্টা করি। এ কারণে সাংবাদিকদের প্রতিটি ইউনিয়ন এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।’
শওকত মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বৈরাচার পতনে জাতীয় প্রেসক্লাবে ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় প্রেসক্লাব মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র। তবে জাতীয় সংস্কৃতিকে বিকশিত করার মতো ভূমিকা প্রেসক্লাবকে নিতে হবে। সুষ্ঠুু সাংবাদিকতা বিকাশে সাংবাদিকদের ঐক্য কেউ ভাঙ্গতে পারবে না।
