বিগত দুই দশক ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে ১০টি বছরের তাপমাত্রা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর গত ২০১৮ সালে বিশ্বের তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। ২০১৭ সালের তুলনায় গত বছরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারও ছিল অস্বাভাবিক রকম বেশি। এটা এখন স্পষ্ট যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমনটি ঘটছে। এরপরও কি আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টাকে হালকাভাবে দেখবো! এটা আসলে কোনো সমস্যা থেকে পলায়নপর মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
এত বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধকল কিভাবে সইবে এ ধরণি! সইতে যে পারছে না সেটা এই ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রত্যন্ত শহর বেলুশিয়া গোবায় একদল শ্বেতভল্লুকের হামলার ঘটনা থেকেই বোঝা গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সাগরের বরফ গলে যাচ্ছে ফলে শ্বেতভল্লুকদের আবাসন সমস্যা ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। সমস্যাটা তাদের চলছে অনেকদিন থেকেই; কিন্তু এখন নিরুপায় হয়ে অনেকটা বাঁচার তাগিদেই জনপদে হানা দিয়েছে তারা। খাবারের সন্ধানে বাড়িঘর দোকানপাটে ঢুকে তাণ্ডব চালায় তারা। সাধারণভাবে শান্ত স্বভাবের শ্বেতভল্লুকগুলো বেশ বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে। লোকজনের দিকে তেড়েও যায় তারা- এমন কথাও জানিয়েছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী।
আসলে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে আরও অনেক প্রাণির মতো পোলার বিয়াররাও আজ অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে। বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ৫০ শতাংশ প্রাণি বিলুপ্ত হবে। কার্বন নিঃসরণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে এমনটাই ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বড় বড় মোটা বরফের চাঁইগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে। অথচ এগুলোই হচ্ছে পোলার বিয়ারের শিকারের মূল ক্ষেত্র। শিকারের জায়গা কমে যাওয়ার কারণেই কিছুদিন আগে ৫২টি পোলার বিয়ারের একটি দল রাশিয়ার শহরটিতে খাবারের সন্ধানে হানা দিয়েছিল। আপাতত খাবারের সন্ধানে বাড়িঘর, দোকানে হামলা চালিয়ে জিনিসপত্র তছনছ করেই ক্ষান্ত হয়েছে তারা, তবে আগামীতে যে তারা মানুষকেই শিকার করে খাবে না, তার কি গ্যারান্টি আছে। বিপদ অবশ্য এখনো কাটেনি, ৮/১০টি শ্বেতভল্লুক এখনো শহরে রয়ে গেছে। ভালুকের ভয়ে হাজার তিনেক লোক ইতোমধ্যে শহর ছেড়ে চলে গেছে।
শুধু রাশিয়া নয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবীর আরও অনেক এলাকায় নিজ আবাসভূমিতে খাদ্য-পানীয় সংকট দেখা দেওয়ায় জনপদে বন্যপ্রাণিদের হানা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। অস্ট্রেলিয়ায় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে গরমে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে আসে ক্যাঙ্গারুসহ দেশটির বিচিত্র কিছু বন্যপ্রাণি। ক্যাঙ্গারুরা পাগলের মতো খাবার খুঁজতে থাকে। গরমে জবুথবু উড়ুক্কু শিয়ালের গায়ে হোসপাইপ দিয়ে পানি ছিটিয়ে তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে স্থানীয় লোকজন।
এছাড়া আফ্রিকা, এশিয়ায় খাবার ও পানির সন্ধানে লোকালয়ে বন্যহাতির হামলার ঘটনা তো প্রায়শই ঘটছে। এরকম ঘটনা হয়তো বার বারই ঘটতে থাকবে, কারণ জানোয়ারদেরও তো বাঁচার অধিকার রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবী একটাই। আর এই পৃথিবীকে সকলের বাসযোগ্য করে রাখতে হলে জলবায়ুও স্বাভাবিক থাকতে হবে। আর জলবায়ু স্বাভাবিক রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা আমাদের অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে।
সূত্র: নিউজউইক
