মরণদশায় কপোতাক্ষ

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৪, ০০:০৭
প্রায় ৩শ কিলোমিটারের স্রোতস্বিনী আজ ৩ জেলার দুঃখের নালা
মাত্র ২৪ বছর আগেও এই নদে চলতো লঞ্চ, বার্জ আর পালতোলা নৌকার বহর
শুষ্ক মৌসুমে নদের বুক শুকিয়ে মাঠ। বর্ষায় অগভীর নদের বুকে দু’কূলছাপানো  জলরাশিতে দুই তীরের জনপদে বন্যা
খননের নামে তৈরি করা হচ্ছে খাল। এখনো একে বাঁচানো সম্ভব এবং তা প্রমাণিত
‘কপোতাক্ষ নদ’ নামে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর কবিতায় ‘সতত হে নদ– তুমি পড় মোর মনে/সতত তোমারি কথা ভাবি এ বিরলে’। সাহিত্য ও ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব লাভ করলেও মানচিত্রে কপোতাক্ষের মরণদশা চলছে। স্নেহের তৃষ্ণা মিটানো দুগ্ধসে াতরূপী সেই নদ এখন ‘সারাদিন এলোচুলে পা ছড়িয়ে বসে মৃত্যুর করুণ গান’ গাইছে। কখন জানি নিঃশেষ হয়ে যায় তার প্রাণ।
মাইকেলের জীবন-তুলিতে আঁকা সেই কপোতাক্ষ এখন নেই। এখন এমন দৃশ্যপট তার যে, সতত যেমতি লোক নিশার স্বপনে/ শোনে মায়া যন্ত্রধ্বনি, তব কলকলে/ জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে’র মতো। বদলেছে তার চেহারা। কখনও হয়ে চলেছে পানি শুকিয়ে মাঠ। কখনওবা পানি উপচে উঠছে দুই ধারের গ্রামে। আবার কখনও পানির ওপরে স্তর পড়ছে ঘন শেওলার। পরিণতি শুধু করুণ, আরো করুণ। এভাবে চললে আগামী প্রজন্মে গল্পের মত জনরব হবে—’ এইখানে এক নদী ছিলো, জানলো না তো কেউ/নদীর জল ছিলো কূল ছিলো, ছিলো নদীর ঢেউ...। এক হতভাগা নদের নাম কপোতাক্ষ।  ১৯৯০ সালেও এই নদ দিয়ে লঞ্চ, কার্গো বার্জ ও সারি সারি পালতোলা নৌকা চলাচল করতো। ২০০১ সালের পর ধীরে ধীরে পলি জমে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। নদের বুকে এখন লঞ্চ-স্টিমার তো দূরের কথা তালগাছের ডোঙাও ব্যবহার হচ্ছে না।
 কপোতাক্ষ নদের পানি একসময় কপোতের অক্ষি বা চোখের মতো ছিল স্বচ্ছ। তাই আদুরে নাম কপোতাক্ষ। এ নদ ঝিকরগাছা, মনিরামপুর, কেশবপুর, সাগরদাঁড়ি, পাটকেলঘাটা, তালা, কপিলমুনি, আগড়ঘাটা, রাড়ুলী, বড়দল, আমাদী, জায়গীর মহল, কয়রা হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া বা খোলপেটুয়ায় পড়ে। এই নদের অববাহিকায় একদিন গড়ে উঠেছিল একটি সভ্য জনপদ। নাইওরে যাওয়ার, নৌকা বাইচের, দু’কূল ছাপিয়ে বন্যার কত স্মৃতি। শ্রাবণের সেতারে মেঘমালার রাগে, প্রণয়ের জোয়ারে, জেলে বৌয়ের সংসার– সব আনন্দ-বেদনার, প্রেম-বিরহের প্রচ্ছদপট আঁকা যেন এ নদীতীরে। এ নদের তীরে গঞ্জ-গ্রামের ভিড়ে ছিল জীবনের জয়গান। কপোতাক্ষ তীরের জনপদ বহু পীর আউলিয়া, সাধক, মুনিঋষি, কবি, সাহিত্যিককে আকৃষ্ট করেছে। দেশের বহু মনীষীর জন্ম ও আস্তানার নিদর্শন এ নদের তীরে জনপদে পাওয়া গেছে। তাদের কিছু কিছু নাম আজও এ দেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে থাকেন। হযরত খাজা খানজাহান আলী (রহ.) তিনি এ দেশে সর্বপ্রথম এসেছিলেন আশাশুনি, পাইকগাছা, কয়রার ত্রিকোণ মিলনস্থান আমাদীর মসজিদকুডা নামে কপোতাক্ষ নদের মোহনায়। একইভাবে বুড়ো পীর জয়নুদ্দিন, হযরত বুরহান উদ্দিন, পীর শেখ ময়েনউদ্দিন, পীর শাহ জাফর আউলিয়া (রহ.), হাজী মেহের উদ্দিন, জিন্দাপীর ধরম চাঁদ, সুন্নি সাধক হযরত আলম শাহ ফকির, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়), কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সাধক কপিলেশ্বরী মুনি, কাজী ইমদাদুল হক, কবি সিকান্দার আবু জাফর কপোতাক্ষ নদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। সেই নদ গেছে শুকিয়ে, সহস শৈবালধাম তার বুকে অনড় অচলায়তনের অবয়ব তৈরি করেছে।
এ নদের কান্না এখন কে শোনে ? একসময় কপোতাক্ষ ছিল খুবই খরস্রোতা। জোয়ার-ভাটায় এক প্রমত্ত সুন্দরী। স্থানভেদে ৩০০ থেকে ১০০০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত ছিল। কপোতাক্ষ দিয়ে একসময় স্টিমার চলাচল করত। ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল সরাসরি কলকাতার সঙ্গে। কপোতাক্ষ নদ ছিল মত্স্য সম্পদে পরিপূর্ণ। এর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল প্রসিদ্ধ জনপদ।
কিন্তু নদ ভরাট হয়ে পড়ার কারণে মত্স্যজীবীসহ নদীর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য মানুষের পরিবর্তন করতে হয়েছে পেশা। পাল্টাতে হয়েছে জীবন-জীবিকার প্রকৃতি। পাঁচটি জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে কেউ কেউ গৃহহারা, যারা নাড়ির টানে পৈতৃক ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে আছেন তাদের বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত পেশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। একদা যে জেলে এ নদের বুকে নৌকা চালিয়ে মাছ শিকার করতেন, তাকেই আজ তীরে বসে শুকিয়ে যাওয়া নদের দিকে তাকিয়ে হতাশায় মৃত্যুর প্রহর গুনতে হচ্ছে। কপোতাক্ষ বাঁচাতে আন্দোলন চলছে বহুদিন থেকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা নেই। বর্তমান সরকার নদটি খননের জন্য বিগত শাসন আমলে ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। বর্তমানে প্রায় ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। পলি জমে এখন আবার ভরাট হয়ে গেছে। খনন কাজ বাস্তবায়নে অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের। কপোতাক্ষ খননের নামে চলছে প্রকল্পের টাকা লুটপাট। চলছে দখলের মচ্ছব।
গত দেড় যুগ ধরে কপোতাক্ষ ২০ লক্ষ মানুষ প্রতি বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই প্রায় ৮ মাস পানিবন্দী হয়ে দিনাতিপাত করে আসছে। কপোতাক্ষ খনন না করায় বার বার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও কৃষিজমিতে বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। জানা যায়, ২৬২ কোটি টাকায় সেনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে এটিকে খনন করার সিদ্ধান্ত হয়; কিন্তু তা এখনও দৃশ্যযোগ্য হয়নি। পাখিমারার বিলে টিআরএম প্রকল্পের জটিলতায় কপোতাক্ষ খননের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। কপোতাক্ষ মরে যাওয়ার ফলে এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যেতে শুরু করেছে। নদীর ওপর নির্ভরতা কমার ফলে ফসলি জমির ওপর এর চাপ বাড়ছে। ফলে এ অঞ্চলের প্রধান প্রাণশক্তি কৃষি চরম বিপর্যয়ে পড়েছে। মরুময়তা চলছে নীরবে; বদলে যাওয়া প্রকৃতি হয়তো মানুষের প্রতি চরম বৈরী আচরণ শুরু করেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
কেন এই মরণদশা?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতা ও নদীর প্রবাহ সম্পর্কে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে নদীর অবাধ প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টির মাধ্যমে ভরাট হতে শুরু করে কপোতাক্ষ নদ। কপোতাক্ষ ভরাটের পিছনে বিভিন্নজন বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, কপোতাক্ষ ভরাট ও জলাবদ্ধতার পিছনে প্রধান কারণ হলো মানব সৃষ্ট নদী বা পানি ব্যবস্থাপনা। ১৭৯৪ সালে তাহেরপুরে ভৈরব থেকে কপোতাক্ষকে বিচ্ছিন্ন করে বাঁধ দেয়া হয়। এরপর অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু ও রেললাইন বসিয়ে কপোতাক্ষকে সঙ্কীর্ণকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৮৬১ সালে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেললাইন বসানোর সময় ভৈরব নদের মুখে দর্শনায় সঙ্কীর্ণ রেল ব্রিজ নির্মাণ করে কুমার, নবগঙ্গা ও চিত্রা নদীর মুখে বাঁধ দেয়া হয়। ১৮৮৩ সালে কলকাতা-খুলনা রেললাইন বসাতে গিয়ে ইছামতি, বেত্রাবতী, কপোতাক্ষ, হরিহর নদ ও নদীতে ছোট ছোট ব্রিজ নির্মাণ করে নদীগুলোর গলাটিপে ধরা হয়। ১৯৩৫ সালে যশোরে ক্যান্টনমেন্ট প্রতিষ্ঠার সময় মুক্তেশ্বরী নদীতে গেট দিয়ে কপোতাক্ষ নদের পানি প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা করা হয়। এর তিন বছর পর ১৯৩৮ সালে দর্শনায় ভৈরব নদের একটি বাঁক ভরাট করে নির্মাণ করা হয় কেরু চিনিকল। এ সময় ভৈরবের অংশবিশেষ ভরাট হওয়ায় মাথাভাঙা থেকে ভৈরব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৬০ সালে ক্রুগ মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী ওয়াপদা গঠন, নদী শাসন, পোল্ডার, বেড়িবাঁধ, উপকূলীয় বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণ করে পাবন ভূমি থেকে নদীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। আর কপোতাক্ষ যখন মুমূর্ষু তখন একশ্রেণীর মানুষ মরিয়া হয়ে তার জায়গা দখল করতে শুরু করে। এরই মধ্যে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও ভারত-বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদীতে ভারত কর্তৃক বাঁধ নির্মাণ এবং পদ্মা নদীর পানি প্রবাহ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব নদী বঞ্চিত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এত অত্যাচারের পর কপোতাক্ষের বেঁচে থাকার মতো আর কোনো সুযোগই ছিল না।
কপোতাক্ষ ভরাটের এসব মূল কারণ ছাড়াও আরও কিছু কারণ রয়েছে, যেগুলো কপোতাক্ষ ভরাটকে ত্বরান্বিত করেছে; যেমন পোল্ডার এলাকায় বেড়িবাঁধ দিয়ে মত্স্য চাষ ও পুরো বিল, জলাশয় আবদ্ধ করে মত্স্য চাষ করা এবং নদীর পানি নদীতে রেখে নদীর বুকে পলি জমার অবস্থা সৃষ্টি করা। সংযোগ খালগুলোতে জাল, পাটা, কোমর দিয়ে মত্স্য শিকার বা আহরণ। স্লুুইসগেটের সামনে-পেছনে পলি জমে ভরাট হওয়া। সংযোগ ও নিষ্কাশন খালগুলোতে পলি জমে ভরাট হওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। ভূমির অবনমন বা নিম্নগামীতা। প্রয়োজনের তুলনায় প্রশস্ত কালভার্ট, পাইপগেট নির্মাণ। নদীর ওপর একের পর এক পিলার ব্রিজ নির্মাণ করে নদীর স্রোত কমিয়ে দ্রুত পলি জমতে সহায়তা করা। স্লুুইসগেটগুলোর ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়ে স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া। নদীতে জেগে ওঠা চর দখল করে মত্স্য ঘের তৈরি করে নদীকে সঙ্কুচিত করা এবং পলি ব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। নদীগুলোতে শ্যাওলা ও আগাছা জন্মে একে অবরুদ্ধ করে স্রোত চলতে না দেয়া প্রভৃতি।
খননের নামে দুর্নীতি-অনিয়ম
কপোতাক্ষ নদ খননের নামে খনন করা হচ্ছে খাল। খননকৃত মাটি স্তূপ করে রাখা হচ্ছে নদের ভিতরেই। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই এ মাটির স্তূপ ধসে ফের নদ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। খনন প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী হচ্ছে না খনন কাজ। খনন কাজ বাস্তবায়নে অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের। কপোতাক্ষ খননের নামে চলছে প্রকল্পের টাকা লুটপাট। জানা যায়, প্রায় ২৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের জুলাই মাসে চার বছর মেয়াদী কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খননে ৬১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এ খনন কাজ ১৫টি গ্রুপে কার্যাদেশ দেয়া হয় ১২টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। যার দৈর্ঘ্য ১৯ হাজার ৪৫০মিটার। এর মধ্যে দুইজন ইউপি চেয়ারম্যানকে টেন্ডার ছাড়াই, অবৈধ ভাবে ৮৫৫ মিটার ও চারজন ইউপি সদস্যকে ৯৪৫ মিটার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে বলে পাউবো সূত্রে জান গেছে। কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, নদের তলা ১০৩ ফুট (৩১.৪০মিটার ) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ১৩০ ফুট (৩৯.৬৪ মিটার) পর্যন্ত চওড়া (প্রস্থ) হবে। আর উপরে (মাথা) ১৪৮ ফুট (৪৫ মিটার) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ২০৩ ফুট (৬২ মিটার) পর্যন্ত চওড়া (প্রস্থ) হবে এবং গভীরতা হবে ১০ ফুট (৩.১০ মিটার) থেকে শুরু করে (স্থান বিশেষ) ১৪ ফুট (৪.২০ মিটার) পর্যন্ত। সরেজমিনে দেখা যায়, কপোতাক্ষ নদের তলা ২২ থেকে ২৫ ফুট, উপরে ৩৫ থেকে ৪০ ফুট ও তিন থেকে চার ফুট গভীর করে খনন করা হচ্ছে। খননের মাটি নদের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। বর্ষায় সে মাঠিতে নদ আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষার অজুহাতে এখন খনন বন্ধ। কপোতাক্ষ নদের এক পাশে খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) দিয়ে খনন করা হয়েছে। আটটি খননযন্ত্র (এস্কেভেটর) দিয়ে এই খনন কাজ হয়। মাগুরা গ্রামের শিক্ষক আলী জানান, কপোতাক্ষ নদ খননে আগেও যে লুটপাট হয়েছে, এবার তাই হচ্ছে। পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা কপোতাক্ষকে দুধের গাভী হিসেবে ব্যবহার করছে। খননের নামে তারা লুটপাট ছাড়া কিছুই বোঝে না। মাগুরা গ্রামের নিমাই দেব নাথ বলেন,’ খনন করে যে ভাবে মাটি রাখা হচ্ছে, এতে ভূমিদুস্যদের চর দখলের সুবিধা হবে। এবার যে যার মতো এ নদের জমি দখল করে নেবে।’ বারুইপাড়া নারায়ন দেবনাথ অভিযোগ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোডের কর্মকর্তারা তদারকি করে না। ফিল্ডে আসে না ঠিকমতো। এজন্য ঠিকাদাররা সুযোগ পায়। ঠিকাদারের পক্ষে কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা জামানুল হক মুন্নি জানান, নকশা অনুযায়ী খনন করার চেষ্টা করছি। তবে সবখানে সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হয় না। কাজ তদারকি কর্মকর্তা (পাউবোর এসও) মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, খনন কাজে কোন প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না। চলতি বছর অর্ধেক খনন করা হবে। বাকী অর্ধেক খনন করা হবে আগামী বছর। তিনি বলেন, এ বছর প্রায় ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
দখলের মহোত্সব
কপোতাক্ষের ভরাট হওয়া বুক দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। প্রভাবশালীদের এখন পোয়াবারো। যার যতো ক্ষমতা সে তত দখল করছে। ধানের চাষ হচ্ছে। কোথাও কোথাও বেড়া দিয়ে চলছে মাছের চাষ। মত্স্য আড়ত তৈরির নামে কপোতাক্ষের জমি দখল করে পাকা ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নদের প্রায় এক একর জমি দখল করে আরসিসি পিলার বসানো হয়েছে। তালা ও পাইকগাছা উপজেলা সীমানায় কপিলমুনি (বিনোদগঞ্জ) বাজারের পশ্চিম পাশে কপোতাক্ষের ভেতরের জমিতেও ইমারত উঠছে। এর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভরাট হয়ে এটি এখন মৃত নদে পরিণত হয়েছে। কপোতাক্ষ এলাকার মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এ জনপদ ধ্বংস করতে ভূমিদস্যুরা নদ দখল করছে।
কপোতাক্ষের জীবন কি ফিরবে?
দেশের নদী বিশেষজ্ঞরা নানা গবেষণা এবং প্রবন্ধে কপোতাক্ষের জীবন ফেরাতে অনেকগুলো সুপারিশ করেছেন। তারা বলেছেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৫০ লাখ মানুষের জীবন এবং আগামী প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সুন্দরবন রক্ষা, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পতিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সুপরিকল্পিত উপায়ে কপোতাক্ষ খননের উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের একটি অংশ বিলীন বা পঙ্গু হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কপোতাক্ষ খনন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সঠিক পদ্ধতিতে অতি দ্রুত কপোতাক্ষকে কার্যকরভাবে খনন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রয়োজনে লুপকাটের মাধ্যমে (লুপকাট হলো নদীর বাঁকগুলো কেটে পানি প্রবাহের পথ সহজ করে দেয়া) কপোতাক্ষের উত্পত্তিস্থল তাহিরপুরের কাছাকাছি বা পাটকেলঘাটা, সাগরদাঁড়ীর উজানে বা ঝাপার বাঁওড়ে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কপোতাক্ষ খনন করা যেতে পারে। পানি প্রবাহ বাড়িয়ে পদ্মার সঙ্গে মাথাভাঙা, ভৈরব এবং কপোতাক্ষের সংযোগ স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া। তীরের সব খাল, বিল, হাওর, মত্স্য চাষমুক্ত করে মুক্ত জলাশয়ে পরিণত করা। উন্নত ব্যবস্থাপনায় যে কোনো পদ্ধতিতে কপোতাক্ষ খনন করে মাটি অনেক দূরে ফেলা। সব দখলদারকে উত্খাত করে কপোতাক্ষের সীমানা পিলার স্থাপন করা। সব সংযোগ খাল, স্লুইসগেট থেকে জাল, পাটা, কোমর, পলি অপসারণ করা। সব সংযোগ খাল, স্লুইসগেটের ব্যবস্থাপনা স্বার্থান্বেষী মহলের দৌরাত্ম্যমুক্ত করা। সব স্লুইসগেট যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত রাখা। কপোতাক্ষের পার্শ্ববর্তী সব নদী বেতনা, মরিচ্চাপ, শালিখা, হাড়কুমড়া, শৈলমারী, হরি, চিত্রা, কুমার, নবগঙ্গা, বেত্রাবতী, ফুটকী, মুক্তেশ্বরীসহ পার্শ্ববর্তী সব নদীর প্রবহমানতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খনন করা। নদী ও খালের ওপর নির্মিত সব বাঁধ ও বাঁশের ব্রিজ অপসারণ । নদীর ওপর নির্মিত সব ধরনের জমানো পিলার ব্রিজ অপসারণ করে ঝুলন্ত ব্রিজ নির্মাণ করা।
এদিকে কপোতাক্ষ বাঁচাও নামের সংগঠনটি মনে করছে কপোতাক্ষকে বাঁচানোর জন্য এখন শুধুমাত্র খননকাজ করে পলি সরালেই চলবে না, বরং প্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য পদ্মা নদীর সাথে কপোতাক্ষের সংযোগ স্থাপন প্রয়োজন। পদ্মার সঙ্গে আগে কপোতাক্ষের সংযোগ ছিল, এই নদকে বাঁচাতে হলে আবার সেই সংযোগ স্থাপন করা আশু প্রয়োজন বলে মনে করেন কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাস। তিনি বলেন, যদি পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করা না যায় তবে খননকাজ করলে তাতে স্থায়ীভাবে কোন সমাধান হবে না। বাংলাদেশের নদীর পানির অধিকাংশই প্রবাহিত হয় পদ্মা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে। কপোতাক্ষ নদ রক্ষায় সকলের সমন্বয়ে মাষ্টারপ্ল্যান তৈরি ও তার বাস্তবায়ন জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ নদকে এখনও বাঁচানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং তার সঠিক ও যুগোপযোগী বাস্তবায়ন। তার প্রমাণ খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের মাঝে অবস্থিত খর্নিয়া ব্রিজের তলদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভরা নদী। যেটি ভরাট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এখানে এ নদীর জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।