অস্ত্র নিয়ে বিমানে ঢুকলো কিভাবে?

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:০৪

চার ধাপের নিরাপত্তার মধ্যেও পাসপোর্ট-বোডিং পাশ না থাকা অস্ত্রধারী যুবক কিভাবে বিমানে উঠলেন- এমন প্রশ্ন এখন মুখে মুখে। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উড়োজাহাজে উঠে যাত্রীদের জিম্মি করার চেষ্টা চালিয়ে মারা যান এক ব্যক্তি। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বেড়াজাল ডিঙিয়ে অস্ত্র নিয়ে গতকাল রবিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুবাইগামী ফ্লাইটে উঠে পড়েছিলেন ওই ব্যক্তি। এখন সর্ব মহলে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যে কোনো দেশের বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর এলাকা। বিমানবন্দর দেশের একটি অহঙ্কার। কাজেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে এর আগেও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। সেই প্রশ্ন যে অমূলক ছিল না, তার প্রমাণ পাওয়া গেল আবারো। বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ঘাটতির প্রশ্ন তুলে ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে বিমানে সরাসরি পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর বিমানবন্দরের পণ্য ও যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশির কাজে ব্রিটিশ একটি নিরাপত্তা কোম্পানিকে নিযুক্ত করা হয়। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী এখন জঙ্গি হামলা হচ্ছে নানা স্থানে। বিমানবন্দরও জঙ্গিদের টার্গেটের বাইরে নয়। এ অবস্থায় বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গতকাল বিকাল ৫টা ১৩ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের উড়োজাহাজটি বিজি-১৪৭ ফ্লাইট হিসেবে দুবাইয়ের উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান থেকে উড্ডায়ন করে। বিকাল ৫টা ৩২ মিনিটে টাওয়ারে জানানো হয়, ফ্লাইটটি ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছে। বিষয়টি তাত্ক্ষণিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করা হয়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভবন থেকে এই বিমান ছিনতাইয়ের অবসানে কমোন্ড অভিযানের পুরো দিক-নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিকাল ৫টা ৪১ মিনিটে ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। মাহাদী নামক ওই অস্ত্রধারী যুবক পাইলটের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তার ‘পারিবারিক সমস্যা’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। উড়োজাহাজটি শাহ আমানতে অবতরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তা ঘিরে ফেলে। এর কিছুক্ষণ পর অভিযানে নামে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। কমান্ডো অভিযান শুরুর ৮ মিনিটের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিটে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থার ওই উড়োজাহাজটি মুক্ত করা হয় বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাঈম হাসান। কমান্ডো অভিযানের নেতৃত্ব দেন লে. কর্ণেল ইমরুল, যিনি হলি আর্টিজানের অভিযানেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাত ৮টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারীকে জখম অবস্থায় আটক করা হয়েছে। তার পৌনে ১ ঘণ্টা পর আরেক সংবাদ সম্মেলনে এসে সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান জানান, আহত ওই ব্যক্তি মারা গেছেন। নিহত ওই ব্যক্তির নাম ‘মাহাদী’। অভিযানের আগেই বিমানের ১৩৪ জন যাত্রীর সবাই নিরাপদে নেমে আসেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছিলেন। ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী এই ব্যক্তি একজন ক্রুকে জিম্মি করেছিলেন বলে বেবিচক ও সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তবে পাইলটসহ ক্রুদের সবাই অক্ষত আছেন বলে জানানো হয়েছে।

এখন সবার প্রশ্ন মাহাদী কিভাবে ওই বিমানে উঠলেন। বিমানবন্দরে প্রবেশ করার পর প্রথমে স্ক্যানিং, বোডিং পাশ, ইমিগ্রেশন এবং সর্বশেষ বিমানে ওঠার সময় চেকআপ করা হয়। প্রতিটি জায়গায় বডি ও লাগেজ চেকআপ করা হয়। বিশেষ করে সর্বশেষ চেকআপে জুতা, বেল্ট, ঘড়ি, মানিব্যাগ, বডি- এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়। বিমানে প্রবেশ করার গেটে বোডিং দেখিয়ে সিটে বসতে হয়। অথচ ওই যুবক কিভাবে বিমানে উঠলো। এক্ষেত্রে বিমানের লোকের সহযোগিতা অবশ্যই প্রয়োজন। বিমানবন্দরে নিয়োজিত ১৯টি সংস্থার যারা ডিউটি করেন, তারা কী ঘুমাচ্ছিলেন, এমন প্রশ্নও অনেকের। বিমানবন্দরে নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, বিমানবন্দরের কারো না কারো সহযোগিতা ছাড়া মাহাদী উড়োজাহাজে উঠতেই পারেন না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান তারা। তারা আরো বলেন, এখানে অনেকে আছেন যারা দলবাজি করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরাও আছেন, যাদের সহযোগিতায় এই ঘটনা ঘটতে পারে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাটবল্টু ঢিলা রাখা নিয়ে ভিভিআইপি নিরাপত্তার বিষয়টি দেশ-বিদেশে আলোচনায় উঠে আসে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পোশাক পরে এক যুবক বিমানবন্দরে ঢুকে এক যাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরে ডে-লেবার (অস্থায়ী নিয়োগ) নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম হয়। একটি সিন্ডিকেট এক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করে। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তারা জঙ্গি কিনা সেটিও দেখা হয় না। অনেকে চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত। তবে নাশকতার বিষয়টি ঘুরেফিরে চলে আসছে। বিএনপি-জামায়াত ভয়াবহ নাশকতা চালানোর চক কষছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা এই ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্খা প্রকাশ করেন।

পরিচালক (বিমানবন্দর) গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, কিভাবে ওই অস্ত্রধারী যুবক বিমানে উঠলো তা তদন্ত করে দেখবো।

সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল নইম হাসান বলেন, কী করে ওই যুবক ঢুকলো তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এটা উদঘাটন করতে মন্ত্রণালয় থেকে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।