রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলামকে হত্যার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে ‘আনসার আল ইসলাম-২’ নামে একটি সংগঠন। শনিবার বিকালে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এই হত্যার দায় স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি পেইজ খুলেছে সংগঠনটি। তবে কথিত সংগঠনটির নাম এর আগে শোনা যায়নি এবং তাদের কোন কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি। বিষয়টি নজরে আসার পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ফেসবুকে দেয়া জঙ্গি গোষ্ঠীর ঘোষণাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এটি কোথা থেকে আপলোড করা হয়েছে, এর সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিউল খুনের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলো জড়িত আছে কিনা তা ডিবির হাতে গ্রেফতার বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, খুনের দায় শিকার করে ফেসবুকে জঙ্গি সংগঠনের দেয়া ঘোষণাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে র্যাব।
কলেজ অধ্যক্ষসহ আটক ১৫
অধ্যাপক শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নগরীর বিনোদপুরের ‘ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ুন আহম্মেদসহ ১৫ জনকে পুলিশ আটক করেছে। রবিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের চারজনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আব্দুল মজিদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের গোয়েন্দা অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদশেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। নগরীর মতিহার থানার ওসি আলমগীর হোসেন বলেন, শনিবার নগরীর চৌদ্দপাই এলাকায় রাবি শিক্ষক শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে দু’জন অংশ নেয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। শনিবার রাতেই প্রত্যক্ষদর্শী জনৈক হাসিব ও দীপু নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ হত্যার ঘটনায় রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি।
আনসার আল ইসলাম-২ নামের ওই পেইজে ড. শফিউল ইসলামকে ‘মুরতাদ’ উল্লেখ করে বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়ঃ ‘দাঁড়ি কাটা ও পাঞ্জাবি-পাজামা না পরার শর্তে শিক্ষক নিয়োগের পর ছাত্রীদের বোরকা না পরে ক্লাসে আসতে নির্দেশ দিয়েছে বিভাগীয় সভাপতি ড. একেএম শফিউল ইসলাম। ‘আজ এই মুরতাদ তার যথাযথ প্রতিদান পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।’ এতে ড. শফিউল ইসলামের ছবিতে লাল ক্রসচিহ্ন দেয়া একটি ছবিতে অপরাধ এপ্রিল ২০১০, শাস্তি প্রদান নভেম্বর ২০১৪। We don’t forget. Insha’Allah we will not forget others. উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, “আল্লাহু আকবার !!! আল্লাহু আকবার !!! আল্লাহু আকবার !!! আমাদের মুজাহিদীনরা আজকে রাজশাহীতে এক মুরতাদকে কতল করেছেন, যে তার ডিপার্টমেন্টে ও ক্লাসে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করেছিল। আল্লাহর ইচ্ছায়, আল্লাহর শক্তিতে ও আল্লাহর অনুমতিতে মুজাহিদীনরা আজকে এই মুরতাদকে কতল করেছেন। ইসলামবিরোধী সকল নাস্তিক-মুরতাদ সাবধান !!!”
এছাড়া ব্লগার রাজীব হায়দার, আশরাফুল আলম, আসিফ মহিউদ্দিন, রাকিব মামুন ও ড. শফিউল ইসলামের ছবি সম্বলিত ওই পেজের কভার ফটোতে লাল ক্রসচিহ্ন ব্যবহার করে “রাজীব হায়দার খতম, আশরাফুল আলম খতম, ড. শফিউল ইসলাম খতম উল্লেখ করা হয়েছে। আর আসিফ মহিউদ্দীন ও রাকিব মামুনের ছবিতে প্রথম প্রচেষ্টা সমাপ্ত, দ্বিতীয় প্রচেষ্ট আসছে” লেখা রয়েছে।
‘উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীই বাবাকে হত্যা করেছে’
এ হত্যার পিছনে প্রগতিশীল চেতনাবিরোধী উগ্রবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন তার একমাত্র ছেলে সৌমিন শাহরিদ (২০)। বাবাকে হত্যার আগে ঐ গোষ্ঠী বাসায় কাফনের কাপড় পাঠিয়েছিল বলে জানান তিনি। রবিবার দুপুরে জোহরের নামাজের পরে শফিউল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হিয়াতপুর ‘সরকার বাড়ি’র উঠানে তাকে দাফন করা হয়।
গতকাল সকালে সাংবাদিকরা ওই বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান, ড. শফিউল ইসলামের কফিন ঘিরে কাঁদছেন স্বজনরা। বাবার লাশের পাশে বসে একমাত্র ছেলে সৌমিন শাহরিদও কাঁদছেন। বৃদ্ধা মা সখিনা বেগম (৮০) বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। মায়ের পাশে বসে কাঁদছিলেন শফিউল ইসলামের চার বোন আইরিন সুলতানা, ওয়াসিম রুমানা, রোখসানা সুলতানা ও সাবিহা সুলতানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সৌমিন শাহরিদ বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে প্রগতিশীল চেতনার আদর্শ বুকে লালন করতেন বাবা। তিনি সবসময় জঙ্গিবাদের বিপক্ষে ছিলেন, মানুষকে ভালোবাসতেন, সত্য কথা বলতেন, সত্যপথে চলতেন। এতে প্রতিক্রিয়াশীল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী তার প্রতি রুষ্ট ছিল। বাবাকে হত্যার আগে ওই গোষ্ঠী বাসায় কাফনের কাপড় পাঠিয়েছিলো। হত্যাকারী কারা তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জানা।’ সৌমিন বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে বাবার হত্যার কোনো বিচার চাই না, কারণ রাষ্ট্রের কাছে আমরা কোনো বিচার পাব না। রাষ্ট্র ভালো করেই জানে কারা প্রতিক্রিয়াশীল, কারা জঙ্গি। কেন সেই জঙ্গিদের বিষদাঁত ভেঙে দেয়া হয় না, কেন তারা এখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে? বাবার মতো এমন একটা ভালো মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার বিচারের ভার জাতির কাছেই ছেড়ে দিলাম।’
ছেলের কফিন ধরে মা সখিনা বেগম বলেন, ‘শুক্রবার রাতেও ছেলেটা মোবাইলে আমার খোঁজ নিয়েছে, ওষুধ আছে কি না জানতে চেয়েছে। গত কোরবানির ঈদে এসে বলেছে, মা হয়তো আর কখনো দেখা হবে না, কিন্তু ছেলের সেই কথা যে সত্যি হবে তা কখনো ভাবিনি।’
