যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশে কবে নির্বাচন হবে সেটা এদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। তবে সবার অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শক্তিই হলো তার গণতন্ত্র। এক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চাই। গতকাল শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান জানতে চাইলে তিনি এ কথা বলেন। এছাড়া তিনি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, জিএসপি পুনর্বহাল, সার্ক সম্মেলনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। রাজধানীর আমেরিকান ক্লাবে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা ও দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে নিশা দেশাই বলেন, আমরা রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র আশা করে, সকল রাজনৈতিক দল তাদের অবস্থান থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রমকে দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করবে।
সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবেলায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৃঢ় সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবেলায় তথ্য আদান প্রদান ও কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারিত্বও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এ সম্পর্ককে আরো জোরদার করতে চাই। শুধু বাংলাদেশ নয় এ অঞ্চলে অন্য অংশীদারদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নিশা দেশাই বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। যেকোনো অপরাধের মামলার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। সকল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা (জিএসপি) ফিরে পেতে বাংলাদেশের কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নিশা দেশাই বলেন, গার্মেন্টস খাতে নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার বিষয়টি ইউনাইটেড ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভস (ইউএসটিআর) পর্যালোচনা করবে।
সার্ক সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিশা দেশাই। সার্ক সম্মেলনের বিষয়ে মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সার্ক নেতারা আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির উপর জোর দিয়েছেন। জ্বালানি সহযোগিতা বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। আরো দুইটি চুক্তি বিষয় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণের জন্য সমন্বিতভাবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে অনেক কাজ করা সম্ভব। দক্ষিণ এশীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে আরো বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতে তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগের (কানেকটিভিটি) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থান বাংলাদেশকে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুইশোর বেশি শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধন হয়েছে, দুই হাজারের বেশি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। অনেকগুলো কারখানা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটির কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে আরো অনেক কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন ও আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফরের সময়সূচি নির্ধারণ বিষয়েও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিন দিনের সফরে গত ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন নিশা দেশাই বিসওয়াল। গতকাল সফরের শেষদিন সকালে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক করেন। দুপুরে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এছাড়া তিনি শ্রমিক ইউনিয়ন ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এর আগে সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার তিনি গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) পরিদর্শন করেন। পরে বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন নিশা দেশাই বিসওয়াল।
