সুন্দরবনে সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল নিয়ে ট্যাংকার ডুবি

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৩১

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের মধ্যবর্তী শেলা নদীর মৃগামারী এলাকায় তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস ওয়েল নিয়ে একটি ট্যাংকার ডুবে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে পেছন থেকে একটি খালি ট্যাংকার ধাক্কা দিলে তেলবাহী ট্যাংকারটির একপাশের খোল ফেটে যায়। পরে ট্যাংকারটি ধীরে ধীরে তলিয়ে যায়। এদিকে ওই ট্যাংকার থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ছে সুন্দরবনে। যে স্থানে ট্যাংকারটি ডুবে যায়, সে এলাকাটি বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ছয় প্রজাতির ডলফিনের অভয়াশ্রম। পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় ডলফিনসহ অন্যান্য জলজ প্রাণির অস্তিত্ব সংকট দেখা দিতে পারে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্যও চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশংকা করছে বনবিভাগ।

দুর্ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন পরিদর্শক রাখা হয়েছে।
ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটি মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোং এর মালিকানাধীন। এ ব্যাপারে মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোং এর ম্যানেজার মো. গিয়াসউদ্দিন বলেন, ডুবে যাওয়া ‘ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন’-এ তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস ওয়েল ছিল। যার বর্তমান বাজার দর দুই কোটি ১৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮০ টাকা। তিনি জানান, ট্যাংকারটি গত সোমবার খুলনার খালিশপুরের পদ্মা ওয়েল ডিপো থেকে তেল বোঝাই করে পোপালগঞ্জের একটি পাওয়ার প্লান্টের উদ্দেশে রওনা হয়। ঘন কুয়াশার কারণে সুন্দরবনের শেলা নদীর মৃগামারী এলাকায় ট্যাংকারটি নোঙর করে রাখা ছিল। মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে এমভি টোটাল নামে একটি খালি ট্যাংকার আমাদের ট্যাংকারটিকে ধাক্কা দিলে সেটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় গিয়াসউদ্দিন বাদী হয়ে মংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
মংলা কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের কনটিনজেন্ট কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেহেদী মাসুদ জানান, ট্যাংকারের নাবিকদের মধ্যে সাতজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও মাস্টার মোকলেসুর রহমান (৫০) নিখোঁজ রয়েছেন। কোস্ট গার্ড সদস্যরা সেখানে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, এমভি টোটাল মংলা বন্দরে পণ্য খালাসের পর              চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল।
ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের তেল সুন্দরবনের নিকটস্থ খালগুলোতে ভাসছে বলে জেলেরা জানিয়েছেন। বনের বিশাল এলাকায় তেলের আস্তর পড়ে আছে। নদীতে ভাসমান এ তেলের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির আশংকা করছেন খোদ বনবিভাগসহ পরিবেশবাদী ও সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পর বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ট্যাংকারটি ডুবে যাওয়ার স্থান দিয়ে অন্যান্য নৌযানকে সতর্কতার সাথে চলাচল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে পূর্ব সুন্দরবনের ডিএফও আমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার পর ডুবে যাওয়া ট্যাংকার থেকে নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। সুন্দরবনে এ তেল প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি হবে জীব বৈচিত্র্যের। তেল ছড়িয়ে পড়ায় বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন ও ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে সকল ধরনের যান্ত্রিক নৌযান চলাচল বন্ধের আহবান জানিয়েছেন।
বেসরকারি সংস্থা সেভ দি সুন্দরবনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনকে মায়ের সাথে তুলনা করে বলেন, সুন্দরবন ধ্বংস হলে সুন্দরবন আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই নদী থেকে তেল শোধনের ব্যবস্থা আছে। যেহতুে এটি একটি স্পর্শকাতর এলাকা তাই এখানে তেল শোধনের উন্নত যন্ত্রপাতি থাকা উচিত।
১৫ দিনে দুটি নৌযান ডুবি

গত ২৪ নভেম্বর ভোরে এই শেলা নদীতেই ডুবে যায় যাত্রীবাহী নৌযান এমভি শাহীদূত। ঘন কুয়াশায় লঞ্চটি শেলা নদীর একটি ডুবোচরে আটকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে এর ডেকের তলা ছিদ্র হয়ে যায়। একপর্যায়ে ভেতরে পানি ঢুকে কাত হয়ে ডুবে যায় লঞ্চটি। সে সময় অবশ্য লঞ্চে যাত্রী ছিল না। ওই নৌযানটি এখনও উত্তোলন করা হয়নি। এমনকি দুর্ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি  প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এমভি শাহীদূত উদ্ধার না হওয়ায় ওই পথ দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারছে না। বিকল্প হিসাবে বনের আরো ভেতর দিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন ধরনের নৌযান। এসব নৌযান থেকে নির্গত বর্জ্য (অপরিশোধিত জ্বালানি) নদীর পানিকে দূষিত করায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গতকালের দুর্ঘটনা আরো বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে।