Å‘যশোরের যশ খেজুরের রস’ আজ রূপকথার মত Åখেজুর রসের হাজার হাজার মণ চিনি ও গুড় রপ্তানি হতো ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশে এবং জাপান, কলকাতাসহ উপমহাদেশের বহু অঞ্চলে Åজাতীয় কবি নজরুল তার গানের সুরে বলেছেন ‘মলিন মুখে দিয়ে দেখ/ নলিন খেজুর গুড়/ বাহির-ভিতর হবে তাহার/ মিষ্টিতে ভরপুর’
বসন্তের সাথে যেমন ফুলের, বৃষ্টির সাথে বর্ষার যে সম্পর্ক, স রকমই সম্পর্কের নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে আছে শিশিরভেজা শীতের সাথে খেজুর রস। দা, কোমরবন্ধ-রশি, বাঁশের নলি, ভাড় নিয়ে গাছির নিপুণ হাতে মধুবৃক্ষ খেজুর গাছের মাথার আস্তরণ চাঁছাছোলা করে নলি বসানোর দৃশ্য জানান দেয় শীত এসেছে।
এই শীতে খেজুরের গুড়ের মৌতাতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গ্রামীণ জনপদ। শীত সকালে রস-পাটালি-নতুন গুড়ের সুবাসে মৌ মৌ করে গৃহ-আঙ্গিনা। রসের পিঠা-পায়েশ খেতে গ্রামে ফেরেন অনেক নাগরিক। এখন মুনাফালোভীদের খপ্পরে পড়েছে খেজুর গুড়-পাটালি। বাজার সয়লাব হয়ে গেছে বিষাক্ত ভেজাল গুড়ে। স্বাদের গুড়ে ঢুকেছে হাইড্রোজ। অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে কারিগররা চিনি, ময়দা ক্ষতিকর চিটাগুড় এবং রং করার জন্য বিষাক্ত কেমিক্যাল হাইড্রোজ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে গুড়। এসব গুড় খেয়ে মানবদেহে কিডনি আর লিভারজনিত রোগের সংক্রমণ ঘটে বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য বার্ষিক প্রায় ২০ লাখ টন চিনি-গুড় প্রয়োজন। কিন্তু দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ লাখ টন গুড় ও ১ থেকে ১.৫ লাখ টন চিনি উত্পাদন হয়। দেশে উত্পাদিত আখের প্রায় ৫০ ভাগেরও অধিক গুড় উত্পাদনে ব্যবহূত হয়। খেজুর ও তালের রস থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টন গুড় উত্পাদন হয়। এই গুড়ের বড় যোগান আসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে। এই জেলাগুলোতে শীতকালটা রস উত্সবের মৌসুম। তবে সেই মধুময় দিন ম্রিয়মাণ এখন।
একদা যে যশোর ছিল খেজুরের রসের ভান্ডার, গৃহকোণে কান পাতলে শোনা যেতো ‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ, গাছ কাটতি যাবো’, সেই ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ হারিয়ে যাচ্ছে। ইটভাটার করাল গ্রাস, বিপর্যয়কর আবহাওয়া, আবাদী জমির সংকোচন, বিরূপ পরিবেশ আর নির্বিচার নিধন তাণ্ডবে সেই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। গ্রামের মাঠে, মেঠোপথের ধারে খেজুর বিথিকার নয়নাভিরাম বাগান এখন আর পথিককে থমকে দেয় না। প্রকৃতিগতভাবে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের মাটি বেলে দো-আঁশ। পানিতে লবণাক্ততা নেই, মিঠা পানি। গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। একারণেই এই অঞ্চলে খেজুরের রস হয় বেশি, তুলনামূলক বেশি মিষ্টি আর সুস্বাদু। রস দিয়ে তৈরি নলেন গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি গুড়ের স্বাদ-ঘ্রাণ যশোরকে বিখ্যাত করেছে। তাই গৃহমগ্ন কবি অনায়াসে গৌরব কীর্তন করতে পারেন:‘খর্জ্জুর বিথী নারিকেল তরু/মাঠ-ঘাট-প্রান্তর/ফুলে ফলে ভরা দিগন্ত প্রসারী/সীমান্ত জেলা আমাদের-এ যশোহর...।
সে এক রূপকথার গল্প ...
যশোরের খেজুরের গুড় থেকে শুধু গুড় ও পাটালি তৈরি হয় না, অতীতে রস ও গুড় থেকে চিনি উত্পন্ন যা একালে রূপকথার কল্প-কাহিনী বলে অনুমিত হবে। ব্রিটিশ আমলে, এমনকি ’৪৭-এর স্বাধীনতা পরবর্তী সময় পর্যন্ত যশোরের খেজুরের গুড়ের চিনির কৌলিন্য ছিল ভুবনজুড়ে। তখন এ এলাকায় খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি ছিল প্রধান শিল্প। যশোর কালেক্টরেটের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, খেজুর গুড় হতে উত্পাদিত ২০ হাজার মণ চিনির অর্ধেক কলকাতায় চালান হতো। এই চিনি সামান্য লালচে হলেও ছিলো আখের চিনির মত ঝরঝরে। গ্রামে যারা অবস্থাপন্ন ছিলো তাদের বাড়িতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খেজুরের চিনিশিল্প গড়ে উঠেছিল। বৃটিশ বণিকরা এই চিনির প্রধান ক্রেতা ছিল। ১৮৬১ সালে ইংল্যান্ডের ‘নিউ হাউজ’ চৌগাছার তাহেরপুরে খেজুরের গুড় থেকে ‘ব্রাউন সুগার’ তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, একসময় যশোর অঞ্চলের প্রধান কৃষিজ পণ্য ছিল খেজুরের গুড়। এই গুড়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল অর্থনৈতিক নানা কর্মকাণ্ড। ১৯০০-০১ সালে পুরো বঙ্গে খেজুরের গুড় উত্পাদিত হয়েছে ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ মণ। এর মধ্যে কেবল যশোরেই উত্পাদিত হয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ মণ, যার দাম ছিল সেই আমলেই ১৫ লাখ টাকা। এই গুড় আমেরিকা-ইউরোপেও রপ্তানি হয়েছে।
খেজুরগাছের জন্যই অষ্টাদশ শতাব্দীতে গ্রাম-গঞ্জে গুড় তৈরির হাজার হাজার কারখানা গড়ে ওঠে। ১৮৬১ সালে প্রথম চৌগাছার তাহেরপুরে কপোতাক্ষ নদের ধারে মি. নিউ হাউস খেজুরের রস দিয়ে চিনি উত্পাদনের যান্ত্রিক কারখানা গড়ে তোলে। এ কারখানায় উত্পাদিত চিনি ইউরোপে রপ্তানি হতো। ১৮৮০ সালে কারখানাটি এমেন্ট অ্যান্ড কোম্পানি কিনে নেয়। ১৮৮৪ সালে এটি ফের বিক্রি হয়ে যায় বালুচরের জমিদার রায়বাহাদুর ধনপতী সিংহের কাছে। ১৯০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে কাশিমবাজারের মহারাজ মনীন্দ্র চন্দ্র ও কলকাতা হাইকোর্টের জজ সারদাচরণ মিত্র কারখানাটি কিনে নেন। তারা জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপে এই কারখানায় উত্পাদিত শত শত মণ খেজুরের গুড় রপ্তানি করেছেন। ১৯৪৭ সালের পূর্বাব্দি কারখানাটি চালু ছিল। পরে আখের চিনির কাছে এই কারখানার পতন ঘটে।
আরো জানা যায়, পুরো বঙ্গদেশের নলেন গুড়ের সন্দেশের ৯৯ শতাংশ গুড় যশোর থেকেই সরবরাহ হতো। উপমহাদেশের বিখ্যাত কলকাতার ‘ভিমনাগের সন্দেশ’ তৈরি হয়েছে যশোরের নলেন গুড় দিয়েই। এখন যশোরের সব মিষ্টির দোকানে তৈরি হচ্ছে নলেন গুড়ের সন্দেশ। কিন্তু সেই নলেন গুড়ের স্বাদ-সুগন্ধ আর পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে যশোরে ১৬ লাখ খেজুরগাছ আছে। প্রতিটি গাছে গড়ে ১৩ কেজি করে গুড় হয়। তাতে দেখা যায়, বছরে ২০ হাজার ৮০০ টন গুড় উত্পাদিত হয়। গড়ে ৮০ টাকা কেজি ধরা হলে ২০ হাজার টন গুড়ের দাম ১৬০ কোটি টাকা। গবেষকরা বলছেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আখের চিনিতে বাজার সয়লাব হওয়া এবং জনসংখ্যা বিপুল বৃদ্ধির কারণে যে সকল জমিতে খেজুরের গাছ ছিল তা কেটে ফেলে সেখানে আবাদী জমি হিসাবে অন্যান্য ফসলের চাষ শুরু হয়। নতুন করে খেজুর গাছের চারা রোপণের হার কমে গেছে। খেজুরের গাছ কমে গিয়ে আজ এমন একটা অবস্থায় এসেছে যে, যশোরের সেই ঐতিহ্য অনেকটা গল্পে পরিণত হয়েছে।
‘যশোরের যশ খেজুরের রস’ জৌলুষ হারিয়েছে
আজ থেকে তিন দশক পূর্বেও যশোরের প্রতিটি মাঠে খেজুর গাছের বাগান ছিল। পথে-ঘাটে, বাড়ির উঠানে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছ রোপণের প্রতিযোগিতা ছিল। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে,আগে শতকরা ৫০-৬০টি পরিবারেরই খেজুর গাছ ছিল। এখন তা শতকরা ২-৩ ভাগে নেমে এসেছে। কয়েক বছর আগে যশোর এলাকায় যে পরিমাণে গাছ ছিল তার বেশিরভাগই এখন নেই। এককালে ঐ অঞ্চলের অন্যতম অর্থকরী এই সম্পদের ওপর এখন নির্ভর করছে খুব কম গাছি। খেজুর গাছ ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। মানুষ রান্নার কাজে খেজুর গাছের পাতা বা ডাল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে অপ্রাপ্ত বয়সে অনেক খেজুর গাছ মরে যাচ্ছে। তাছাড়া উইপোকা ও গণ্ডারপোকা গাছের ছালে ও সুরঙ্গ করে খেজুর গাছ ধ্বংস করে ফেলে। খেজুর গাছের জন্মস্থান মেসোপটেমিয়া বা ইরাক। বাংলাদেশে যে জাতের বুনো খেজুর জন্মে তার বৈজ্ঞানিক নাম Phoenix Sylvestris. খেজুর গাছ সাধারণত সব ধরনের মাটিতে জন্মায় তবে দোআঁশ ও পলি মাটিতে উত্পন্ন গাছ থেকে বেশি রস পাওয়া যায়। বাংলাদেশের যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার মাটি খেজুর গাছের জন্য উপযোগী। বৃহত্তর যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, চৌগাছা, কোটচাঁদপুর, ঝিকরগাছা, নড়াইল, মাগুরাসহ বিভিন্নস্থানে খেজুর গাছ থেকে রস, গুড় ও পাটালি উত্পন্ন হয় বেশি। যশোরের খাজুরার নামকরণের মধ্যে খেজুর গাছ ও রস-গুড়-পাটালির মাহাত্ম রয়েছে। বাংলাদেশের যে কোন জায়গার চেয়ে খাজুরের পাটালির দাম বেশি এবং মানে অনেক এগিয়ে। এই পাটালি দেখতে অনেকটা মিছরির মত এবং লালচে বর্ণের। পাটালির সারা শরীর মোটা দানায় ভরা থাকে এবং কখনো কখনো কাঁচের মত মনে হয়। এ গুড় বাইরের দিকে শক্ত তবে ভিতরে রসে পরিপূর্ণ। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে এ পাটালির ব্যাপক চাহিদা।
‘মলিন মুখে দিয়ে দেখ নলিন খেজুর-গুড়’
ছড়ার জাদুকর সুকুমার রায় ’সবচাইতে বেশি ভালো পাউরুটি আর ঝোলা গুড়’-র গুণকীর্তণ করা হলেও যশোরের খ্যাতির মুকুটে আছে নলেন গুড়। এগুড় পিয়াসী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ’ফেরতা’ তালে বলেছেন, ’মলিন মুখে দিয়ে দেখ নলিন খেজুর-গুড়/ বাহির-ভিতর হবে তাহার মিষ্টিতে ভরপুর/ওগো মিষ্টিতে ভরপুর/ নলেন গুড় আসে এক বিশেষ ধরনের খেজুর রস থেকে, যাকে এ অঞ্চলের মানুষ ’নলেন রস’ বলে থাকে। নলেন গুড় থেকে তৈরি হয় সন্দেশ, ক্ষির-পায়েস প্রভৃতি। এই গুড় নিত্য মেলে না। এর প্রক্রিয়াও বড় কঠিন। আশ্বিনের শেষের দিকে খেজুর গাছকে প্রস্তুত করতে হয় এই রস আহরণের জন্যে। গাছের বাকল কেটে “গাছ তোলা” হয়। গাছ তোলাশেষে গাছ কাটার পালা। কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ধারালো ’গাছি দা’ দিয়ে সপ্তাহে নির্দ্দিষ্ট দিনে গাছ কেটে রস আহরণ করা হয়। গাছের মাথার দিকের নরম অংশকে কেটে সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে রস নল দিয়ে ফোটায় ফোটায় জমা হয় ভাঁড়ে। প্রথম রস একটু নোনা। গাছি এক কাটের পর বিরতি দেন। কিছুদিন বিরতির পর আবার কাটেন। এবারের রস সুমিষ্ট, সুগন্ধে মৌ মৌ চারিদিক। এর সুবাস আর স্বাদ নিতে ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি ও কাঠবিড়ালী। এই রসের নামই ’নলেন রস’। এই রস দিয়ে যে গুড় হয় তাই নলেন গুড়। যশোরের খাজুরা এলাকায় এই গুড়ের খ্যাতি আছে সারাদেশে।
স্বাদের গুড়ে হাইড্রোজ
আশার গুড়ে বালি নয়, স্বাদের গুড়ে চিনি আর বিষ ঢুকেছে। চিনি কেড়ে নিয়েছে খেজুরের রসের যশ। খুশবুময় নলেন গুড়কে করে তুলেছে ঘ্রাণ ও স্বাদহীন। লালচে রঙের কথিত খেজুরের গুড় কিনে ঠকছে ক্রেতারা এবং ক্রমেই তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভেজাল গুড়ে সয়লাব বাজার। বাজারে সোনালী, হালকা লাল, চকচকে, উজ্জ্বল সাদাটে গুড় দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই গুড়েই যে হাইড্রোজ নামক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। আখ, খেজুর, তাল রসের গুড়ের রঙ হাইড্রোজ দিয়ে আকর্ষণীয় সোনালী করা হয়। অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে চিনি, ময়দা ক্ষতিকর চিটাগুড় এবং রং করার জন্য বিষাক্ত কেমিক্যাল হাইড্রোজ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ভেজাল পাটালি গুড়। এই গুড় তৈরির প্রণালী হলো-চিনি, ময়দা, আলু, ঝোলা গুড়, চিটাগুড় খেজুরের পাটালি গুড় মিশিয়ে বিশাল আকৃতির কড়াইতে জ্বাল দেয়া হয়। ১০০ কেজির ভেজাল গুড়ের মধ্যে ৫০০ গ্রাম বিষাক্ত কেমিক্যাল হাইড্রোজ ও সালফেট মিশিয়ে আকর্ষণীয় রং তৈরি করে ‘খেজুরের পাটালি গুড়’ বানানো হয়। চিনির মূল্য পাইকারি হিসাবে প্রতি কেজি ৫৫ টাকা। আর গুড় প্রতি কেজি পাইকারি বিক্রি করা হয় ৯৫-১০৫ টাকায়। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই ভেজাল গুড়ে সয়লাব দেশের বাজার।
শীত মৌসুমকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীরা এক থেকে দেড় মাস আগে থেকেই ভেজাল গুড় তৈরি শুরু করেন। অনেকে রসিকতা করে এসব গুড়কে হাইব্রিড খেজুরের গুড় বলে আখ্যায়িত করছে।
পেশা যখন গাছ কাটা
নানা রকম সমস্যা ও প্রতিকূলতার মাঝেও খেজুর গুড় শিল্প দেশের অর্থনৈতিক এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। প্রতি বছর সারা দেশে হাজার কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ২৫ হাজার টন খেজুর গুড় উত্পাদন হচ্ছে। আর এ শিল্পের সঙ্গে কাজ করে কয়েক লাখ লোক তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে খেজুরের গুড়। প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে ব্যাপক চাহিদা থাকায় এসব দেশে খেজুরের গুড়ের বাজার বাড়ছে। খেজুর গুড় উত্পাদন ও বিপণনের সঙ্গে বিভিন্ন পেশার লোক জড়িত। যার মধ্যে রয়েছে– গাছি, কুমার, কামার, বাঁশ শিল্পী, আড়তদার, পাইকার ও পরিবহন শ্রমিক। গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশে রস সংগ্রহ করার মতো আনুমানিক ৭০ লাখ খেজুর গাছ আছে। আর এসব গাছ থেকে বছরে এক লাখ ২৫ হাজার টন খেজুর গুড় উত্পাদন করার মতো রস সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। পাইকারি হিসাবে প্রতি কেজি খেজুরের গুড় ৮০ টাকা করে ধরলেও বছরে উত্পাদিত খেজুর গুড়ের মোট মূল্য দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকা। আর এই পরিমাণ গুড় উত্পাদন কাজে জড়িত হয়ে লক্ষাধিক লোক জীবিকা নির্বাহ করছে। শীতের শুরুতে খেজুর গুড় উত্পাদন শুরু হয়। চলে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত। একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুর গাছের রস থেকে ২০ কেজি পরিমাণ গুড় তৈরি হয়ে থাকে। বিশেষত যশোর এলাকায় পুরো মৌসুম জুড়ে গাছ কাটা, রস সংগ্রহ, গুড়-পাটালি তৈরি ও বাজারজাতকরণের সাথে ব্যস্ত সময় পার করেন প্রায় এক লাখ পরিবার।
খেজুর গাছ উন্নয়ন বোর্ড চায় গাছিরা
এখন শীতকাল তাই অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুর গাছের কদর বেড়েছে। কারণ এ গাছ এখন দিচ্ছে মিষ্টি রস। দেশে অন্যান্য স্থানের চেয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিশেষ করে যশোর অঞ্চলে প্রচুর খেজুর গাছ জন্মাত। কোনরকম খরচ ও পরিচর্যা ছাড়াই অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠত খেজুর গাছ। এর চারা বর্ষাকালে রোপণ করলে সহজেই বেঁচে যায়। চারার জন্য বীজতলার কোন প্রয়োজন নেই। খেজুরের বীজ যেখানে পড়ে সেখানেই চারা গজিয়ে বড় হয়। তবে পরিকল্পনামাফিক বপন করলে ৫/৭ বত্সরের মধ্যে রস আহরণের উপযোগী হয়। সাধারণত ছোট গাছের চেয়ে বড় গাছের রস বেশি সুস্বাদু এবং গুড়, পাটালি ও বেশি চিনি উত্পাদিত হয়। এই গাছ অত্যন্ত শক্ত ও আঁশযুক্ত। এই গাছ ২০/৩০ হাত পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা যায়। তবে আমরা যে পরিমাণ গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি সেই পরিমাণ গাছ লাগাই না। যা কিছু লাগাই তাও আবার পরিকল্পিতভাবে লাগাই না। রেলপথ, সড়কপথ ও নদীর দু’ধারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গাছ লাগানো যেতে পারে। সাধারণত ৪/৫ হাত দূরত্বে ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার গর্ত করে মাটি ভালভাবে রোদ খাইয়ে এক মাস পর ছাই, মাটি ও গোবর দিয়ে পূরণ করতে হবে। এরপর গাছ লাগাতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছায়া ও রোদ এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ ও বর্ষার সময় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে প্রতিবছরই জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করলে খেজুর গাছে বেশি রস পাওয়া যায়। যশোরের পলীবধূরা এক সময় খেজুর পাতা দিয়ে বিভিন্ন প্রকার নকশা করা পাটি, ঝুড়ি, ঝাড়ু ও অন্যান্য জিনিস তৈরি করত।
যশোর অঞ্চলের গাছিরা চান, খেজুর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হোক। এতে করে অর্থকরী খেজুরের রস, গুড়, পাটালির আগের অবস্থা আবারো ফিরে আসবে। এদিকে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বনবিভাগের উদ্যোগে ২০১৩ -১৪ সালে বৃক্ষরোপণ অভিযানে বেশকিছু খেজুর গাছ রোপণ করা হয়। বৃহত্তর যশোর জেলার জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে রোপণ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ খেজুর গাছের চারা। দেশি জাতের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে আরব দেশীয় খেজুরের চারাও রোপণ করা হয়। বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এলাকার মানুষ খেজুর চারার সুফল পাবে। আগে কখনও এভাবে খেজুরের চারা রোপণ করা হয়নি।
ঘিওরে খেজুরের গুড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল
মো. শফি আলম, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, জেলায় ঘিওর উপজেলায় চিনি ও বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরির মহোত্সব চলছে। দিনে দিনে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে ওই অসাধু চক্রটি। এদিকে ভেজাল গুড় তৈরি ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাজারে চিনির চেয়ে গুড়ের দাম বেশি থাকায় এবং বেশি লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়েই ঘিওর উপজেলার বাইলজুড়ী, বড়টিয়া, ঘিওর বাজারসহ বিভিন্ন গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে গড়ে উঠেছে ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা। পরে এসব ভেজাল গুড় ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। খেজুরের রস সংগ্রহ শুরুর আগ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায় ভেজাল গুড় তৈরি অব্যাহত থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এরপরেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
এদিকে সামান্য কিছু লাভের আশায় এসব অসাধু ব্যবসায়ীর কবলে পড়ে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। সরেজমিনে দেখা যায়, ঘিওর উপজেলার বাইলজুরী গ্রামের মো. বাবুল প্রধান দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। তিনি বলেন, গুড় তৈরিতে বাজার থেকে পুরানো গুড় কিনে বাড়িতে কিনে এনে ভাল করে জাল দিয়ে তার সাথে চিনি, হাইডোজ এবং রঙ দিয়ে থাকি। এতে অবিকল খেজুরের গুড় তৈরি হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সব জিনিসেই ভেজাল, আমাকে একা বলে লাভ নেই। এই একই উপায়ে উপজেলায় একটি চক্র দীর্ঘ ১০ বছর ধরে খেজুরের রস ছাড়াই ভেজাল গুড় তৈরি করছে। এ ভেজাল গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে চিনি তৈরির উচ্ছিষ্ট (চিটাগুড়), আটা, চিনি, ফিটকিরি ও ডালডা। রঙের নামে মেশানো হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত কেমিক্যাল। এসব উপাদান দিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করে খেজুরের গুড় হিসেবে তারা বাজারজাত করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবা আইরীন বলেন, যে চিটাগুড় দিয়ে নতুন খেজুরের গুড় তৈরি হচ্ছে, সেই চিটাগুড় গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। যা মানুষের খাবারের অনুপযোগী। এছাড়াও গুড় তৈরিতে মেশানো হচ্ছে চিনি, আটা ও বিষাক্ত কেমিক্যাল। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি অভিযান করেছি। জনস্বার্থে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। মানিকগঞ্জের সিভিস সার্জন ডা. শাহ আলম জানান, একমাত্র চিনি ও আটা ছাড়া ভেজাল গুড় তৈরির অন্যসব উপাদানই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এতে বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো থাকায় তা আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না। এ ধরনের ভেজাল গুড় খেলে কলেরা, ডায়রিয়া, হজম শক্তি হ্রাসসহ পেটের পীড়া এবং অ্যালকোহল থাকায় ঝিমুনি দেখা দিবে।