৬০ হাজার হেক্টরের বোরো আবাদ অনিশ্চিত

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪, ০১:২৬

শুকনো মৌসুম শুরু হতে না হতেই তিস্তায় পানির জন্য হাহাকার উঠেছে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় পানি না থাকায় বোরো চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। ব্যারেজ থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার এখন হেঁটে যাওয়া যায়। গত মঙ্গলবার সকালে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প পয়েন্টে পানি প্রবাহমাত্রা ছিল প্রায় ৬শ’ কিউসেক। অথচ প্রয়োজন ৩ হাজার কিউসেকের ওপরে। পানির অভাবে প্রধান ও শাখা সেচ নালা এলাকার আশপাশের কৃষকরা জমি তৈরি করতে পারছেন না। ফলে আসন্ন বোরো আবাদ প্রকল্প এলাকায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে পানি সরিয়ে নেয়ায় তিস্তার বাংলাদেশ অংশ মরে গেছে। অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা সেচ প্রকল্প। প্রকল্পের আওতাধীন ৬০ হাজার হেক্টর জমির বোরো চাষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। 

ব্যারেজ সূত্রে জানা যায়, ভারত কর্তৃক তিস্তার গজলডোবা ব্যারেজের সব গেট বন্ধ করে দেয়ায় তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্প এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে সেখানে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার কিউসেক পানি থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ৬শ’ থেকে সাড়ে ৬শ’ কিউসেক। যা চাহিদার তুলনায় মাত্র ৬ ভাগের এক ভাগ। তিস্তা এখন অনেকটাই মরা খাল। ডালিয়া পয়েন্ট থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার এখন ধু ধু বালুচর।
ভারত নীলফামারীর ডালিয়ার তিস্তা ব্যারেজের ১০০ কিলোমিটার উজানে কুচবিহার জেলার মেকলিগঞ্জ থানার গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ দিয়ে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে প্রকল্পের আওতাধীন উত্তরাঞ্চলের ৩ জেলার ১২ উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।  
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প সূত্র জানায়, সেচ প্রকল্প এলাকায় সেচ দেয়া এবং নদীর প্রবাহমাত্রা ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে স্বাভাবিক প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ২০ হাজার কিউসেক পানি। শুধু সেচ প্রকল্প চালাতেই প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ১৪ হাজার কিউসেক এবং নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন ৪ হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু ডিসেম্বরে  তিস্তায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। শুধু তাই নয়, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ব্যারেজ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ফসল ও বাসাবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভারত তখন সব গেট খুলে দেয়। এতে ব্যারেজের ৪৪টি গেট ২৪ ঘন্টা খুলে দিয়ে পানি সরানো সম্ভব হয় না। এই অতিরিক্ত পানি অপসারণের জন্য প্রকল্পের উত্তরে ৬১০ মিটার একটি খাল নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮ সালে বন্যায় এই খাল ধ্বংস হয়ে অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকরা জানান, ব্যারেজ প্রকল্পের পানি দিয়ে অল্প খরচে বোরো ধান চাষ করা যায়। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতেই ব্যারেজ সংলগ্ন জলঢাকা উপজেলার ৮০নং খাল এবং চাপানী ৪০ নম্বর খালেও পানির প্রবাহ একেবারেই কম। অন্য দিকে তিস্তা নদী সংলগ্ন লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, নীলফামারীর জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, ডোমার, ডিমলা, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্প এলাকার কৃষকরা এখন পর্যন্ত জমিতে বোরো লাগাতে পারেননি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুব রহমান জানান, তিস্তার পানির সমস্যাটি দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক বিষয়। যেটুকু পানি পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়েই রেশনিং পদ্ধতিতে সেচনালা এলাকায় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন ছাড়া পানি সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষিবিদরা জানান, এ অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে কৃষি উত্পাদন দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। প্রতি বছরই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ২ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে অগভীর সেচ পাম্পগুলো ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীর গর্তে নামিয়ে সেচ কাজ চালানো হচ্ছে। তাতেও ঠিকমতো পানি না ওঠায় পাম্পগুলো ৫ থেকে ৬ ফুট মাটির গভীরে নামিয়ে পানি উত্তোলন করা হয়। রংপুর বিএডিসির সেচ রিজিওয়ানাল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম সহিদুল আলম জানান, অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে মৌসুমের পিক আওয়ারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ রাখার ব্যবস্থা করলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পাওয়া যেতে পারে।

রংপুর বিএডিসি (সেচ) অফিস সূত্রে জানা যায়, গতবারের চেয়ে এবার এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আগাম নেমে যেতে শুরু করে। অনেক স্থানে পানির স্তর ২৫ থেকে ৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ ফুটের ওপর। তবে  নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কৃষক মজিদ উদ্দিনের দাবি, তিনি দেড়শ ফুট মাটি খুঁড়েও পানি পাচ্ছেন না। তার মতো অবস্থা অনেক কৃষকের। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ১৮ থেকে ২৫ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে ঠিকমতো পানি উঠে না ক্রমাগত পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে। ফলে বোরোসহ অন্যান্য ফসলের প্রায় ২ লাখ হেক্টরের আবাদ নিয়ে এখন থেকেই শংকিত হয়ে পড়ছেন কৃষকরা। সূত্র মতে, রংপুরের পীরগাছা, বদরগঞ্জ, পীরগঞ্জ ও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে নেমে গেছে।