পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক সংহত, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্রে তা ভারতের চেয়েও ভাল। দেশের সর্বত্র উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ বিরাজ করায় আমাদের এ সাফল্য। কোন সরকারই চিরস্থায়ী নয়, সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু এ পরিবর্তন বা ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতি হবে শান্তিপূর্ণ। নির্বাচন ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের বিধান আমাদের সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বিধানকে এড়িয়ে কেউ ক্ষমতায় যেতে বা ক্ষমতা দখল করে রাখতে পারে না। তবে কেউ কেউ যে চোরাগুপ্তা হামলা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, শান্তি ভঙ্গ, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে সরকার বদলের চেষ্টা করছেন তা হচ্ছে গণতন্ত্র বহির্ভূত প্রক্রিয়া। তিনি গতকাল শনিবার পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কয়েকটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, কারও কারও ভাবনা-চিন্তায় ৭৫’র ১৫ আগস্টের মত কোন আকস্মিক পরিবর্তনের ঘটনা ঘুরপাক খেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটে না। তাদের এ খায়েশ অস্বাভাবিক চিন্তা। বর্তমানে দেশের মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতাকে প্রত্যাশা করে। যার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অর্জনের উপায়কে নিশ্চিত করতে চায়। আজকে দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে তা শুধু সরকারি খাতেই নয়, বেসরকারি খাতও আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সবদিকেই উন্নয়নের এই ধারা সমানভাবে বহমান। আনোয়ার হোসেন বলেন, রাজনীতিবিদদের সহিষ্ণু হতে হয়। বিভিন্ন সময় আমরা বোমা হামলার শিকার হয়েছি, নির্যাতন, জেল-জুলুমের মোকাবেলা করেছি। কিন্তু হিংসার বশে আমরা কোন প্রতিশোধমূলক আচরণ করিনি। মানুষের সমর্থনে গত ৩০ বছরে বার বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে সংসদে বসেছি। বিভিন্ন সময় পাঁচ বার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য হয়েছে, যার সময়কাল ১৪ বছর। এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের উপলব্ধি হয়েছে রাজনীতিবিদদের জ্ঞানী-গুণী-শিক্ষিত এবং চালাক-চতুর হতে হয়। আমাদের সামনের দিনগুলো ভাল কাজে লাগাতে হবে, সরকার পরিবর্তনের জন্য চার বছর বা নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে সংগতি রেখে অনেক ভাল ভাল কাজ করছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি দেশ পরিচালনায় যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। বর্তমানেও সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের সম্পদ প্রয়োজনের তুলনায় কম। সবাই বিদ্যুত্ চায়। হয়তো জাতীয় গ্রীড থেকে সব জায়গায় বিদ্যুত্ সরবরাহ সম্ভব নয়, তাই সরকার দুর্গম অঞ্চলে সৌর বিদ্যুত্ ব্যবস্থা স্থাপন করে এই চাহিদা পূরণে সচেষ্ট রয়েছে। এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। গ্রামের মানুষ অনেকাংশে ভাগ্যবান। তাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনার মত দূষিত বাতাস, দূষিত খাবার, শব্দ দূষণ মোকাবেলা করে জীবন ধারণ করতে হয় না। বিশুদ্ধ বাতাসে মুক্ত পরিবেশে সবুজ প্রান্তরে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে বেঁচে থাকার যে ব্যবস্থা তা তাদের আল্লাহতালা প্রাকৃতিকভাবে প্রদান করেছেন। এই জন্য যে অবস্থায় থাকি না কেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তারপরও গ্রামের মানুষ অবহেলিত, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বস্ত্র-সুষম খাদ্য-বাসস্থানসহ নানা অবকাঠামোগত সুবিধা তারা পর্যাপ্তভাবে পায় না। বিগত ৩০ বছর দক্ষিণাঞ্চলে আমি মানুষের এসব মৌলিক চাহিদা পূরণের কথা বলে এসেছি। মানুষের সহযোগিতায় এসব অভাব পূরণে অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টিতে নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেছি। এলাকার মানুষের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন সব সময়ে আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, এলাকার মানুষ তথা সর্বস্তরের নেতৃত্ব এক থাকলে, আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান হলে জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল শনিবার বিকালে কাউখালী উপজেলার আমরাজুড়ি ইউনিয়নের গন্ধর্ব জানকীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থানীয় জনসাধারণের সাথে এক মতবিনিময় সভা করেন। প্রদীপ কিশোর হালদারের সভাপতিত্বে এখানে আরও বক্তব্য রাখেন ইউপি চেয়ারম্যান কৃষ্ণ লাল গুহ ও মৃনাল কান্তি হালদার। এ সময় মঞ্চে ছিলেন কাউখালীর ইউএনও মোঃ শহীদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, কাউখালী উপজেলা জেপি’র সভাপতি মাহবুবুর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ আলম তালুকদার প্রমুখ। রাতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী কাউখালী উপজেলার ছোট বিড়ালজুড়িতে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এখানে আরও বক্তব্য দেন কাউখালী সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমিনুর রশীদ মিল্টন। এসময় মঞ্চে ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট নূরুল হক, যুগ্ম সম্পাদক উপাধ্যক্ষ সনজিত কুমার সাহা, সাংগঠনিক সম্পাদক সুনীল কুন্ড প্রমুখ। দুপুরে মন্ত্রী সয়না-রঘুনাথপুর ইউনিয়নের মধ্য বেতকা বায়তুন নূর জামে মসজিদ সংলগ্ন হোগলা-রঘুনাথপুর-সয়না-হুলারহাট খেয়াঘাট সড়ক কার্পেটিং দ্বারা পুনর্বাসন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মোনাজাত করেন। এরপর তিনি এখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এসময় অন্যান্যের মধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু সাইদ মনু, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুকুল ইসলাম, জেপি সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস খান, উপজেলা যুব সংহতি সভাপতি জাকির হোসেন নসু, ছাত্র সমাজের উপজেলা সভাপতি মঞ্জুরুল মাহফুজ পায়েল, সম্পাদক জিয়াউল আহসান জুয়েল প্রমুখ মোনাজাতে অংশ নেন। বিকালে মন্ত্রী কাউখালী গার্লস হাই স্কুল-কেউন্দিয়া সড়ক কার্পেটিং দ্বারা উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এলজিইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী মো. নাসিম হাসান, উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোসলেহ উদ্দীন, আওয়ামী লীগের সাবেক উপজেলা সভাপতি সিদ্দিকুল ইসলাম খান প্রমুখ। সন্ধ্যার পর কাউখালী হাই স্কুল মাঠে দুস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিভাগের ঢেউটিন ও অনুদানের চেক বিতরণ করেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবির, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক মনিরুজ্জামান পল্টন প্রমুখ। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু রাতে সম্প্রতি প্রয়াত জেপির কাউখালী উপজেলার সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম বেলায়েত আলী খান আবু শাহানের কবর জিয়ারত ও রুহের মাগফিরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ করেন। এরপর মন্ত্রী কাউখালীর বিড়ালজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম-সাইক্লোন শেল্টার সংযোগ সড়ক কার্পেটিং দ্বারা উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
ভাণ্ডারিয়া সংবাদদাতা জানান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল শনিবার সকালে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় উত্তর ভিটাবাড়িয়া সওজ-কাপালিরহাট জিসি ভায়া এনায়েত খার হাট-সরদারের হাট সড়ক উন্নয়ন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী সওজ সড়ক হতে ২নং উত্তর ভিটাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন কাজের পৃথক ভাবে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ উপলক্ষে স্থানীয় বায়তুল ফালাহ নূরানী কিন্ডার গার্টেন মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন ইঞ্জিনিয়ার মো. মঈনুল হোসেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশিদ, জেপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মো. খলিলুর রহমান খলিল, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. নাসিম হাসান, জেপির উপজেলা যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ভাণ্ডারিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, জেপি নেতা ইউসুফ আলী আকন, আবুল কালাম পোদ্দার, রেজা আহম্মেদ দুলাল, সাব্বির হোসেন, জাতীয় যুব সংহতির উপজেলা আহ্বায়ক শহীদুজ্জামান রাজু মল্লিক, সদস্য সচিব মনির সরদার, যুগ্ম-আহ্বায়ক মামুনুর রশিদ সরদার, মামুন হাওলাদার, উপজেলা ছাত্র সমাজের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম সিমুল আকন, সদস্য সচিব সালাহ উদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার প্রমুখ। এছাড়াও ভিটাবাড়িয়া মঞ্জু মাকের্টে শিপার্স কাউন্সিল বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। সভাপতিত্ব করেন শিপার্স কাউন্সিল বাংলাদেশ-এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মৃধা।
দুস্থ কল্যাণ সংস্থার কম্বল বিতরণ
গতকাল শনিবার ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর প্রতিষ্ঠিত দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। এসব ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সকালে ভাণ্ডারিয়ার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের সেনেরহাটে অসহায় দরিদ্র মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। দুপুরে শিয়ালকাঠি চৌরাস্তায় কাউখালীর শিয়ালকাঠি ইউনিয়ন ও চিড়াপাড়া ইউনিয়নে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন যথাক্রমে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান সিকদার দেলোয়ার হোসেন ও নজরুল ইসলাম বাদশা, জেপির কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন কবির রাজুসহ ইউপি সদস্য ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বিকালে সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের হোগলা বেতকা হাই স্কুল মাঠে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাইদ মনু, বিশিষ্ট সমাজকর্মী জাহিদ হোসেন সিকদার প্রমুখ। রাতে কাউখালী হাই স্কুল মাঠে কম্বল বিতরণ করা হয়। শীতবস্ত্র বিতরণ কাজ তদারক করেন দুস্থ কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা এম এ রব্বানী ফিরোজ, কর্মকর্তা কাজী আতাহার আলী ও শাহ আলম নসু।