মেধাবী ছাত্র মিনহাজুল ইসলাম অনিক (১৫) ও শাহরিয়ার হূদয় (১৬) দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাদের; কিন্তু অবরোধের নৃশংসতা এই দুই ছাত্রের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিল। বোমার আঘাতে তাদের দুইজনের ডান চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই চোখে আর পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে না তারা। অন্য চোখও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের।
ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার তাদের এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় পরীক্ষা মনে হয় দেয়া হচ্ছে না তাদের।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দুই ছাত্রের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহনের ঘোষণা দিয়েছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অবরোধে পেট্রোল বোমা ও অগ্নিসংযোগে চিকিত্সাধীন দগ্ধদের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করার ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
৫ জানুয়ারি বিকাল ৪টায় ফেনীর ট্রাংক রোডে খেজুর চত্বরে পরপর দুইটি বোমা নিক্ষেপ করে পিকেটাররা। প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন অনিক ও হূদয়। দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া বোমাগুলো বিস্ফোরণ ঘটে অনিক ও হূদয়ের মুখমণ্ডলে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে তারা, ঝরতে থাকে রক্ত। তাদেরকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাদেরকে ঢাকার শেরে বাংলানগর চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
অনিক ফেনীর দাগনভূঞায় উপজেলার জয়লস্কর গ্রামের বাসিন্দা প্রবাসী মিজানুর রহমানের ছেলে। অনিকের বোন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। অনিকের শয্যাপাশে বাবা মিজানুর রহমান ও মা জেসমিন রহমান বসে চোখের পানি ছেড়ে পুত্রকে সান্ত্বনা দিতে দেখা গেছে। অনিক মাকে বলে, ‘এসএসসি পরীক্ষায় আমি অংশগ্রহণ করতে পারব? ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি মা। প্রশ্ন শুনে বাবাও কেঁদে ফেলেন। অনিকের স্বপ্ন- সে চিকিত্সক কিংবা প্রকৌশলী হবে। প্রায়ই বাবা-মাকে একথা বলত। স্বপ্নকে সত্যি করতে দিনরাত পড়াশোনাও করছিল। ছেলের সেই স্বপ্ন আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা এমন প্রশ্ন রেখে বাবা-মা অঝোরে কাঁদছিলেন। বোমার আঘাতে অনিকের বাম চোখ কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঝুঁকি রয়েছে। বোমায় তার মুখমণ্ডলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দাগনভূঞা উপজেলার হীরাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল খায়েরের ছেলে হূদয়। সেও পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। হূদয়ের ইচ্ছে বড় হয়ে প্রযুক্তিবিদ হবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্ষুদে বিজ্ঞানী হিসেবেও ইতিমধ্যে সাড়া জাগিয়েছে সে। চাইল্ড পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকারও মনোনীত হয়েছিল হূদয়। রোবোট ও বিদ্যুত্ উত্পাদনের মেশিন তৈরি করে ফেনী জেলা প্রশাসনের প্রথম পুরস্কার পেয়েছে হূদয়। বন্ধু আরাফাত ও নিলয়কে নিয়ে হূদয় নানা কিছু উদ্ভাবনে চেষ্টা চালাচ্ছিল। ছেলের স্বপ্ন অনিশ্চয়তায় পড়ায় বাবা এবং মা রোজী রওশন আকতারের মনে আক্ষেপ। হূদয়ের বিভিন্ন সময় প্রযুক্তি বিষয়ে পাওয়া সনদের ফাইল ধরে তারা অঝোরে কাঁদছিলেন। হূদয় তার বাবা-মাকে প্রশ্ন করেন, আমি কি আর কখনো প্রযুক্তিবিদ হতে পারব না। সেই প্রশ্নের উত্তর বাবা-মা দিতে পারেননি। হূদয় বুঝতে পারে, তার স্বপ্ন আর পূরণ হওয়ার নয়। বোমার আঘাতে ডানচোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার। চলে গেছে তার চোখের দৃষ্টিশক্তি। বাম চোখে আঘাতের পরিমাণ কম হলেও, ঝুঁকি রয়েছে। অনিক ও হূদয়ের বাবা-মা বললেন, এ দুঃসময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সহযোগিতার জন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল আহমদ বলেন, অনিক ও হূদয়ের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বাম চোখও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের। অনিককে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় ভারতের চেন্নাই পাঠানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং হূদয়কে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বার্ন ইউনিট ও চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অবরোধে দগ্ধ চিকিত্সাধীন রোগীদের দেখতে যান। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাদেরকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। ঐ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী, বিএমএ-এর সভাপতি ডা. মাহমুদ হাসান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান উপস্থিত ছিলেন।
