চট্টগ্রামে রোজগার বন্ধ ২৫ হাজার হকারের

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০২:৩৪

মো. ইউসুফের বাড়ি দিনাজপুরে। পেটের তাগিদে ছয় মাস আগে চট্টগ্রামে আসেন তিনি। নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতে তার একটি দোকান রয়েছে। অস্থায়ী এই দোকানটিতে ইউসুফ বাচ্চাদের পোশাক বিক্রি করেন। বেচাকেনা মন্দ না, দৈনিক ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। পুলিশ, সমিতির চাঁদাসহ নানা রকম ঝক্কিঝামেলা মেটানোর পর প্রতিদিন হাজারখানেক টাকা আয় হয় তার। নিজের খাই-খরচা বাদ দিয়ে ইউসুফ বাকি টাকা দিনাজপুরে পরিবারের কাছে পাঠাতেন।

গত ছয় মাস এভাবে ভালোই চলছিল। অভাবের সংসারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছিল। হাতে কিছু টাকাও জমেছিল। কিন্তু গত এক মাস ধরে টানা অবরোধ ও হরতালে ব্যবসা লাটে উঠেছে ইউসুফের। বেচাকেনা নেই বললেই চলে। দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক দুর্যোগ গ্রাস করেছে ইউসুফের পরিবারকেও।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিউমার্কেট এলাকায় কথা হয় ইউসুফের সাথে। তিনি জানান, এখন ৫০০ টাকাও বিক্রি হয় না। তার মা খুবই অসুস্থ। টাকার অভাবে মায়ের চিকিত্সা হচ্ছে না। মহাসড়কে যানবাহন না চলায় অসুস্থ মাকে দেখার জন্য তিনি দিনাজপুরও যেতে পারছেন না।
ইউসুফের পার্টনার মো. আলী হোসেন জানান, প্রতিবছর জানুয়ারি মাসটা স্কুলের ইউনিফর্ম বিক্রির সময়। এতে তাদের ভালোই আয় রোজগার হয়। এই আশায় এবারও চড়া সুদে ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে বাচ্চাদের ইউনিফর্ম দোকানে তুলেছিলেন। বছরের শুরু থেকেই লাগাতার অবরোধ-হরতালের কারণে বেচাকেনা প্রায় বন্ধ। এখন ঋণের আসল টাকা দেয়া দূরের কথা, সুদের টাকাও দিতে পারছেন না।
শুধু ইউসুফ আর আলী হোসেনই নয়। অবরোধ-হরতালে ঘুম হারাম হয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ২৫ হাজার হকারের। গতকাল আরো কথা হয় নগরীর ষোলশহর বিপ্লব উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাতের কয়েকজন হকারের সাথে। জাহেদুল ইসলাম নামে এক হকার জানান, গত এক মাসে তার প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। দৈনিক যা বিক্রি হয় তা দিয়ে ৫ জনের সংসার চালানো তার পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছে। জাহেদুলের পাশের দোকানদার আবদুল মান্নান জানান, দুপুর একটা পর্যন্ত তার দোকানে কোন কাস্টমার নেই। অথচ দেশের পরিস্থিতি                 স্বাভাবিক থাকলে এই সময়ের মধ্যে তার কয়েক হাজার টাকা বিক্রি হতো। মনজু নামে একজন জানান, তাদের এখন ব্যবসার মূল পুঁজি ভেঙে খেতে হচ্ছে। সোহেল জানায়, দোকানের বৈদ্যুতিক বাতির জন্য দৈনিক ৩০ টাকা করে দিতে হয়। এখন সেই টাকাও তার দিতে কষ্ট হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হকার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম মিয়া ইত্তেফাককে বলেন, নানা কারণে চট্টগ্রামের ফুটপাতের হকারদের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে। গত কিছুদিন ধরে ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করার নামে পুলিশ তাদের ওপর বারবার চড়াও হয়েছে। ইপিজেড, ষোলশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ কয়েকটি এলাকায় ফুটপাত থেকে হাজার হাজার হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। গত এক মাস অবরোধ আর হরতালের নামে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। কিছু দরিদ্র মানুষ নিজের শিশু সন্তানের মুখে একটু ভাত তুলে দেয়ার জন্য সামান্য কিছু পুঁজি খাটিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করছে। তারা রাজনীতি করে না। কিন্তু রাজনীতির প্রথম বলি হচ্ছে তারাই। চট্টগ্রাম সম্মিলিত হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি মিরন হোসেন মিলন বলেন, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পরিবার পরিজন নিয়ে খুবই দুর্বিষহ অবস্থা। অবরোধ হরতালের প্রতিবাদে হকাররা আগামী সপ্তাহে রাজপথে নামবে বলে জানান তিনি।