ঠাঁই নেই ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০১:১১

অবরোধ ও হরতালে চরম নৃশংসতায় পেট্রোল কিংবা যানবাহনে অগ্নিসংযোগে দগ্ধদের চিকিত্সাসেবার একমাত্র ভরসা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। এছাড়া বছরে মিল কারখানা বাসাবাড়িসহ বিভিন্নভাবে গড়ে ৯ লক্ষাধিক লোক দগ্ধ হয়। এদের একমাত্র চিকিত্সাসেবার শেষ ঠিকানা এই বার্ন ইউনিট। ঢাকার বাইরে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে নামেমাত্র বার্ন ইউনিট থাকলেও পোড়া রোগীদের চিকিত্সা সেবার জন্য অভিজ্ঞ জনবল ও যন্ত্রপাতিসহ তেমন কোন অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। পোড়া রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিতে গিয়ে হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগে যত্রতত্র রেখে দেয়া হলে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে সর্বাধিক। এ ব্যবস্থায় পোড়া রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। পোড়া রোগীদের চিকিত্সা ব্যবস্থা বিশেষায়িত। প্রধানত প্লাষ্টিক সার্জনদের অধীনে পোড়া রোগীদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করতে হয়।  লাইনচ্যুত হলে ট্রেন যেমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, তেমনিভাবে পোড়া রোগীদের চিকিত্সা ব্যবস্থা লাইনচ্যুত হলে মৃত্যুর আশংকা ানেক বেড়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। বিশ্বব্যাপি চিকিত্সা বিজ্ঞানে এ বিষয়টি স্বীকৃত। এদেশে এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ, মতলববাজ ও রাজনৈতিক মতাবলম্বী আমলারা বিষয়টি বুঝেও না বুঝার ভান করেন। লক্ষ লক্ষ পোড়া রোগীর জীবন বাঁচাতে প্লাষ্টিক সার্জারি ও বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন কিন্তু উল্টা ঐসব আমলারা প্লাষ্টিক সার্জারি ও বার্ন ইউনিট সম্প্রসারণ করতে নানা অজুহাতে বাধার সৃষ্টি করে আসছেন।

সাম্প্রতিককালে পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২ শতাধিক লোক দগ্ধ হয়। তাদের মধ্যে ১২১ জন ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে মারা যান। তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে এসব দগ্ধদের দেখতে গিয়ে তখনই পোড়া রোগীদের চিকিত্সা সেবার অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী পোড়া রোগীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ ডা. সামন্ত লাল সেনকে প্রধান করে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিট সম্প্রসারণসহ ঢাকার বাইরে সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিট স্থাপন দায়িত্ব দেয়া হয়। এরইমধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে অত্যাধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ও অপারেশন থিয়েটারের সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা খুবই সীমিত। ঢাকার বাইরে তিন জায়গায় বৃহত্ অবকাঠামো তৈরী করে বার্ন ইউনিট চালু করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাকি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অভিজ্ঞ জনবলসহ অবকাঠামো ছাড়াই নামে মাত্র চালু করা হয় এই ইউনিট।
বিএনপিসহ ২০ দলের টানা অবরোধ ও হরতালে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগে প্রায় প্রতিদিন খেটেখাওয়া মানুষ দগ্ধ হচ্ছে। সারাদেশ থেকে ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হচ্ছে তাদের। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সব দগ্ধদের পাশে দাড়িয়েছেন। চিকিত্সা সেবার ব্যয়ভার বহন করছেন। যাদের বিদেশে চিকিত্সার প্রয়োজন, তাদেরকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতিমধ্যে দগ্ধ দুই এসএসসি পরীক্ষার্থী, একজন বিচারক, একজন ট্রাক চালককে চিকিত্সার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও ৩শ বেডের বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন ৬ শতাধিক পোড়া রোগী চিকিত্সাধীন থাকে । জনবল সীমিত। গতকাল রবিবার বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল ৫৫৯ জন। বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সামন্তলাল সেন সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলেও দিনরাত বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম এবং অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে সীমিত জনবল দিয়ে এ বিশাল সংখ্যক পোড়া রোগীকে সামাল দিতে তারা রীতিমত বাসাবাড়ি ছাড়া। প্রতিদিনই দগ্ধ রোগী আসছে।  এদের সামাল দিতে কি যে অসহনীয় অবস্থা চিকিত্সকরা তা চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না। অনেক ডাক্তার পরিবারের সদস্যদের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তারা বলেন, পোড়া রোগীরা যন্ত্রনায় ভুগছেন।  এছাড়া এ চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। নিরীহ রোগীদের পক্ষে ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব।
এ অবস্থায় তাদের সুচিকিত্সা না হলে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই ঘড়ির কাটা দেখার মত তাদের সময় নেই বলে চিকিত্সকরা জানান। পোড়া রোগী সুস্থ হলেও স্বাভাবিক জীবন তারা ফিরে পায় না। পরবতীর্তে তাদের প্লাষ্টিক সার্জারি করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এ চিকিত্সা ব্যয় বহুল। সহিংসতায় দগ্ধ সুস্থ, ৬ জনকে গতকাল পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে প্লাষ্টিক সার্জারি করা হয়। তারা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন বলে অধ্যাপক ডাঃ সাজ্জাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে পোড়া রোগীদের সুচিকিসার্থে অভিজ্ঞ জনবল তৈরী করার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল বার্ন ইউনিটকে ইনস্টিটিউট করার নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বার্ন ইউনিটকে ইনস্টিটিউট করার ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু জনবল নিয়োগসহ অন্যান্য অবকাঠামোর জন্য জনপ্রশাসনের অনুমতি নিতে গেলে ফাইল ফেলে রাখা হয়। দেখানো হয় নানা অজুহাত। প্রতিদিন বার্ন ইউনিটের দুঃসহ অবস্থা দেখতে এবং  চিকিত্সা সেবায় এগিয়ে আসছে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আইএফআইসি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বার্ন ইউনিটের দোতলায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক ৩৬ বেডের আইসিইউ প্রতিষ্ঠার কাজ গতকাল থেকে শুরু করেছে। এ বিভাগ চালু হলে বেঁচে যাবে অনেক পোড়া রোগী। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচারাল ব্যাংক নগদ ১০ লাখ ও লকপুর গ্রুপ ৪০ লাখ টাকা গতকাল বার্ন ইউনিটের চিকিত্সা সেবার অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে। পোড়া রোগীদের এখন সবচেয়ে ঝুঁকির কারণ হচ্ছে ইনফেকশন। কারণ, এক শ্রেণী মিডিয়া কর্মী পরিচয়ে দলে দলে লোকজন বার্ন ইউনিটে গিয়ে ভিডিও করছেন। চিকিত্সাধীন রোগীদের জীবন রক্ষার্থে বহিরাগতদের যাতায়াত বন্ধ রাখার আহ্বান জানান চিকিত্সকরা।
চট্টগ্রাম বার্ন ইউনিটে ৩০ শয্যায় রোগী ৬১ জন

চট্টগ্রাম মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট ৩০ শয্যার স্থলে বর্তমানে ৬১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু চিকিত্সাধীন রয়েছে। ইউনিটে অপারেশন থিয়েটার নেই, দক্ষ নার্স নেই, দক্ষ চিকিত্সকের সংকট রয়েছে। ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. মৃণাল কান্তি দাশ ইত্তেফাককে বলেন, ‘বোমা হামলায় আহতদের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। চিকিত্সাধীন সকলেই মোটামুটি শংকামুক্ত। প্রয়োজনীয় ঔষধ বিনা মূল্যে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ১৫ জন সার্জারী চিকিত্সককে বার্ন চিকিত্সা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। যাতে আহতদের স্ব-স্ব হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা দেয়া যায়।’