ভাষা শহীদদের স্মরণে ১৯৫৪ সালে মানিকগঞ্জে নির্মিত হয়েছিল মানিকগঞ্জ অঞ্চলের প্রথম শহীদ মিনার। শহীদ মিনারটি শহরের এসকে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে রাস্তার পাশে অবস্থিত। বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এর যথাযথ মর্যাদাও রক্ষা করা হচ্ছে না। শহীদ মিনারটি সারাবছরই অযত্নে-অবহেলায় নোংরা অবস্থায় থাকে। প্রতিদিনই শহীদ মিনারের উপর বসে সন্তানদের বাড়ি নেয়ার জন্য বসে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। প্রতিদিন বসার কারণে এটি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। সুশীল সমাজ অনতিবিলম্বে এটি সংস্কার এর যথাযথ মর্যাদা রক্ষার দাবি করেছেন।
জানা গেছে, ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তত্কালীন ছাত্র-জনতা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য। কয়েকটা শহীদ মিনার নির্মাণ করাও হয়। কিন্তু তত্কালীন পাকিস্তান সরকার সেগুলো ভেঙে ফেলে। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার জন্য ছাত্র নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনার তৈরির জন্য আবারো সোচ্চার হয়। শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য এগিয়ে আসেন যুক্তফ্রণ্ট সরকারের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের সহধর্মিণী উম্মে সাহেরা খাতুন। মানিকগঞ্জ শহরের এসকে বালিকা বিদ্যালয়ের বিপরীত দিকে সাহেরা খাতুন তার বাড়ির সামনেই শহীদ মিনার নির্মাণের অনুমতি দেন। ২০ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। শহীদ মিনার নির্মাণের খবর পাওয়া মাত্র তখনকার এসডিও একে দত্ত চৌধুরী বিপুলসংখ্যক পুলিশ নিয়ে সেখানে হাজির হন শহীদ মিনার ভাঙার জন্য। এসময়ে শহীদ মিনারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন উম্মে সাহেরা খাতুন। বলেন, “আমার জায়গায় আমি শহীদ মিনার বানিয়েছি। কার সাহস তা ভাঙে?” তার এই কথায় থেমে যায় এসডিও এবং পুলিশ বাহিনী। শহীদ মিনার ভাঙার সাহস পেলেন না তারা।
১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার ঢল নেমেছিল সেখানে। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে গিয়েছিল শহীদ মিনারের বেদী। কিন্তু ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের্র পর শহীদ মিনারটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় পাকহানাদার বাহিনী। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর ঠিক একই স্থানে একইভাবে পুনরায় গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনারটি। ২০০৭ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রশাসনের উদ্যোগে মানিকগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হলে প্রায় পরিত্যক্ত হতে বসে এই শহীদ মিনারটি। সাংস্কৃতিক কর্মী-সংগঠকদের দাবির মুখে মানিকগঞ্জ পৌরসভার পক্ষ থেকে মূল শহীদ মিনারটির আদল বদলে দিয়ে সিরামিক টাইলস লাগিয়ে নতুন করে এটাকে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু এরপর থেকে অযত্নে আর অবহেলায় রয়েছে শহীদ মিনারটি। খান বাহাদুর আওলাদ হেসেন খান অনার্স কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, কলামনিষ্ট ও সাংবাদিক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু জানান, মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার এই জনপদের মানুষের, আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, লড়াই- সংগ্রাম, গৌরবের প্রামাণ্য দলিল, ঐতিহ্যের অংশ। এটিকে হারাতে দেওয়া ঠিক হবে না। এর ঐতিহাসিক মূল্য অসীম। যে কোনো মূল্যে আমাদের প্রথম শহীদ মিনারকে টিকিয়ে রাখতেই হবে। এই শহীদ মিনারকে বাঁচিয়ে রাখাটা মানিকগঞ্জের বিবেকবান মানুষের দায়, রাজনীতিকদের দায়।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী কামরুল হুদা সেলিম বলেন, যারা শহীদ মিনার দেখেও তার উপর বসে তাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী শহীদ মিনারটিকে সংস্কার করতে হবে।
