কেমিক্যাল সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউ

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫৬

আইন লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর পুরান ঢাকায় অবাধে কেমিক্যাল বা রাসায়নিকের ব্যবসা চলছে। অবৈধভাবে কেমিক্যাল ব্যবহার, সংরক্ষণ, বিপণন ও সরবরাহ সবই চলছে চোখের সামনে। কেমিক্যাল আমদানি করার লাইসেন্স প্রাপ্তি ও বিপজ্জনক কেমিক্যালসহ নানা দাহ্য পদার্থের ব্যবহার, বিপণন ও সরবরাহের নানা বিধান থাকলেও তা তোয়াক্কা না করেই পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশে অবৈধভাবে একচেটিয়া এ ব্যবসা চলছে। আইন ও শাস্তির বিধান যতটুকুই আছে, তা পড়ে আছে কাগজে-কলমে। বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যে যেভাবে পারছে অবাধে বিপজ্জনক কেমিক্যালের ব্যবসা করছে।

রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিধি লঙ্ঘন করে কেমিক্যাল আমদানি, পরিবহন, মজুদ, বিতরণ, উত্পাদন, শোধন, মিশ্রণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে পুনঃব্যবহার কিংবা বিতরণের স্থান বা পরিবহনরত যানের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ব্যক্তি লাইসেন্সের কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে, এসব কাজে নিযুক্ত ব্যক্তি যদি ধারা ১৩ এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে-(অ) উক্ত স্থানে বা ক্ষেত্রমতে যানে কোনো কেমিক্যাল পরিদর্শনের সময় বা উক্ত পরিদর্শনে যুক্তিসঙ্গত সহযোগিতা প্রদানে অস্বীকার বা অবহেলা করেন, অথবা (আ) কেমিক্যালের নমুনা সংগ্রহ করতে অসহযোগিতা করেন এবং ধারা ২৪ এর অধীন কোনো দুর্ঘটনার সংবাদ প্রদানে ব্যর্থ হন, তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বিস্ফোরক পরিদপ্তর সূত্র বলছে, বিস্ফোরক দ্রব্য যেমন পটাশিয়াম, সালফার, গানপাউডার জাতীয় কোনো পদার্থ বেআইনিভাবে ব্যবহার করলে তার জন্য ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ অন্যান্য ধারাতে কঠোর সাজার বিধান রয়েছে।

তবে আট শতাধিক কেমিক্যালের মধ্যে ২০-২৫টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কেমিক্যালের ক্ষেত্রে শুধু এসব আইন কার্যকর রয়েছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে কোনো বিধান নাই। অথচ চকবাজার অগ্নিকাণ্ডে পারফিউমসহ বিভিন্ন প্রসাধনীর ক্যান বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়েছে। বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক মো. শামসুল আলম বলেন, ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কেমিক্যাল ছাড়াও বিভিন্ন পারফিউম, আগর বাতি, আতর তৈরির কেমিক্যালগুলোও ক্ষতিকর। যা চকবাজারের ঘটনায় প্রমাণিত।’

কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হয়েও বিপদে ব্যবসায়ীরা : জানা গেছে, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করতে হবে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম। তারপর এর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। তখন শর্ত দেওয়া হয়েছিল, কেরানীগঞ্জে না গেলে ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। নির্দেশনা মেনে ২০০ ব্যবসায়ী কেরানীগঞ্জে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের গুদাম স্থানান্তর করেন। তবে গুদামগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় না গড়ে বিভিন্ন খোলা ও নিরাপদ জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্থাপন করা হয়। পরে সেসব জায়গায় গুদামের আশেপাশে বসতবাড়ি, দোকান, বাজার গড়ে উঠে। ফলে ব্যবসায়ীরা কেরানীগঞ্জে গিয়েও নিরাপদে নেই।

আরও পড়ুন: আজ দুই সিটিতে ভোট, আগ্রহ কম ভোটারদের

তারা বলছেন, নিমতলীর ঘটনার পর সরকারের নির্দেশনা মেনে ঢাকার বাইরে যখন গুদাম স্থানান্তর করা হয়েছে, তখন আশেপাশে ছিল খোলা জায়গা। এখন সে সব স্থানে বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এতে আমরা এখন বিপদে পড়েছি। সর্বশেষ চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের পর শঙ্কা প্রকাশ করে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের এখানেও যদি কোনো বিপজ্জনক ঘটনা ঘটে তার দায় কে নেবে? এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিল্পমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ প্রিকার্সর এন্ড এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যাল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবসায়ীরা। সংগঠনটির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, কেরানীগঞ্জে নির্ধারিত জায়গায় আমাদের যে পরিমাণ জায়গা লাগে, তা দিলে আমরা সেখানে যেতে রাজি আছি। আমরা নিরাপদ জায়গায় থাকতে চাই।

ইত্তেফাক/আরকেজি