সব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হার ১৫ শতাংশ না রেখে ভিন্ন ভিন্ন হারে (হ্রাসকৃত) ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বুধবার রাজধানীর কাকরাইলের আইডিইবি ভবনে ভ্যাট আইন নিয়ে এক আলোচনায় এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ এ আহ্বান জানান।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ব্যবস্থা প্রচলনের দাবি থেকে আমরা (ব্যবসায়ীরা) সরে আসিনি। ব্যবসায়ী এবং সরকার—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী—আগামী দুই বাজেটে যাতে ক্রমান্বয়ে এটি সমন্বয় করা হয়।
ভ্যাটদাতাদের নতুন ভ্যাট আইন সম্পর্কে সচেতন করতে আয়োজিত এ আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক শেষে অভিন্ন হার রেখেই ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হবে বলে জানিয়েছেন।
আইএমএফের ঋণের শর্ত প্রসঙ্গ টেনে কাজী আকরাম বলেন, ‘আইএমএফ তো বলে এটা ছাড় করবে না, ওটা ছাড় করবে না। কিন্তু আমাদের সব কূল রক্ষা করে, দেশের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন—আগামী দুই বাজেটের মধ্যে এটি সমন্বয় করা হবে। আমরা তাতে আস্থা রাখছি।’
আলোচনায় অর্থমন্ত্রী নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘কিছু দেশে বহুস্তরের ভ্যাট ব্যবস্থা থাকলেও আন্তর্জাতিক ধারা হচ্ছে একই হারে ভ্যাট। এটি ব্যবসায়ীদের জন্যও সহজ হবে। সে জন্য চিন্তা করেছি—অভিন্ন হারেই ভ্যাট রাখব। তবে টার্নওভার ভ্যাটমুক্ত সীমা ৩০ লাখ টাকার ওপরে রাখা হবে।
এ সময় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা ১৫ শতাংশ ভ্যাটকে অনেক বেশি আখ্যা দিয়ে তা কমানোর দাবি জানান। ভ্যাট আইনের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে একজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বলেন, ‘জোর করে কোনো কিছু হয় না। আমরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু করলে বেশি দূর এগোনো যাবে না।’
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বারের (ফিকি) প্রেসিডেন্ট রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অবিশ্বাস বেশি।’ বাংলাদেশের সাথে ইউরোপের তুলনা না করে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী ভারতের সাথে তুলনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এত উচ্চ হারে ভ্যাট নিলে কী ভাবে টিকে থাকব? বড় কোম্পানির পক্ষে ভ্যাট বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের জন্য তা ভেবে দেখা দরকার।’
ন্যাশনাল পলিমারের প্রতিনিধি ওমর ফারুক বলেন, ‘মূল্য ঘোষণা প্রথা উঠে গেলে জটিলতা বাড়তে পারে।’
এ সময় এনবিআর সদস্য (ভ্যাট পলিসি) ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, ‘নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের হিসাব রাখা সহজ ও ঝামেলা মুক্ত হবে।’ মূল প্রবন্ধে নতুন ভ্যাট আইনের বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে সরকার নতুন ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন পাস করে। এর তিন বছর পর অর্থাত্ আগামী জুলাই থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এক বছর পিছিয়ে আগামী বছরের জুলাই থেকে এটি কার্যকর হচ্ছে। কিন্তু আইএমএফের পরামর্শে নতুন ভ্যাট আইন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষিত হয়েছে—এমন অভিযোগে ব্যবসায়ীরা এ আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বিদ্যমান প্যাকেজ ভ্যাট প্রথা বাতিল করে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ এবং টার্নওভার (বার্ষিক বিক্রি) ভ্যাটমুক্ত সীমা ২৪ লাখ টাকা করা হয়। এ দুটি ধারা নিয়েই ব্যবসায়ীরা আপত্তি তোলেন। তাদের আপত্তির মুখে সরকার আইনটি পর্যালোচনায় নতুন কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিও বাস্তবতা বিবেচনায় হ্রাসকৃত হারে (ভিন্ন ভিন্ন হারে) ভ্যাট আরোপ ও টার্নওভার ভ্যাটমুক্ত সীমা ২৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করার সুপরিশ করেন। এর পর বেঁকে বসে আইএমএফ। ঝুলে যায় সংস্থাটির দুই কিস্তির ২৮ কোটি ডলারের ঋণ ছাড়। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাটের অভিন্ন হার রাখার শর্তে ওই দুই কিস্তি ছাড় করানোর অঙ্গীকার পান অর্থমন্ত্রী। তবে অর্থমন্ত্রীর এমন অবস্থানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
