মতিঝিলে শিমু আক্তার ওরফে সুমি (২৩) খুনের ঘটনার পেছনে মাদক ব্যবসা ও পুলিশের সোর্স হয়ে কাজ করার কারণ খুঁজে পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত সুমি ও তার স্বামী নাসির উদ্দিন দুজনেই একসময় মাদক ব্যবসা করতেন। হঠাত্ করে সুমি পুলিশের সোর্স হয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করেন। এদিকে সুমির স্বামী ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন এবং ভ্রাম্যমান আদালত তাকে একবছরের সাজা দেয়। সুমি চেয়েছিলেন তার স্বামী ভালো হয়ে অন্য কোনো কাজ করুক। এজন্য তিনি এলাকা থেকে মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে পুলিশের হয়ে কাজ করেন। একে একে ওই এলাকার আরো কয়েক মাদক ব্যবসায়ীকে ধরিয়ে দেন সুমি। এর জের ধরেই মাদক ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে খুন করে সুমিকে।
গতকাল সোমবার দুপুরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, গত রবিবার রাতে রাজধানীর গোপীবাগের রেললাইন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ সুমি ওরফে শিমু হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃরা হলেন, মো. সাইদুল ইসলাম (২৭), হানিফ (২৬), রাতুল আহাম্মেদ (২৩), নুরুন্নবী শাওন (১৯), মো. সুজন (২৩) ও মো. সুমন ওরফে তোতলা সুমন (২৪)। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে একটি ছুরি, একটি চাপাতি, কাগজের তৈরী বল (স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো) যা দিয়ে ভিকটিমের মুখ বন্ধ করা হয়, একটি কাঠের গুঁড়ি (যার ওপরে ভিকটিমের হাত ও পা কাটা হয়), কেরোসিন তেলের বোতল এবং আসামিদের রক্তমাখা শার্ট ও প্যান্ট উদ্ধার করা হয়। আদালতে গ্রেফতার সাইদুল, হানিফ, রাতুল ও শাওন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে গ্রেফতার সুজন ও সুমন জবানবন্দি না দেয়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে রাখা হয়েছে এবং বাকিদের কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের বরাদ দিয়ে তিনি বলেন, ফকিরাপুল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আসামী সুজন, রাতুল, শাওন, মিকি মাউস ওরফে আলম, তোতলা সুমন, বাংলা সোহেল, হানিফ, কালু, কাননদের দলনেতা মো. সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে ইয়াবা ও হেরোইন ব্যবসা করে আসছে। ভিকটিম সুমি ওরফে শিমু তাদের পূর্ব পরিচিত। সাইদুল ও মন্টিকে কয়েকবার ইয়াবাসহ ভিকটিম শিমু পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেন। এরপর থেকেই সাইদুল ও মন্টির সঙ্গে ভিকটিম শিমুর বিরোধের সৃষ্টি হয়। ঘটনার ৪/৫ দিন আগে সুমির স্বামী নাসির ইয়াবাসহ পুলিশের কাছে ধরা পড়ে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক বছরের সাজা হয়। এ ঘটনায় সুমি, সাইদুল, সুজন, হানিফ ও মন্টিকে দায়ী করে বিভিন্ন জনের কাছে অভিযোগ করে বেড়ান।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, ঘটনার দিন ৯ মার্চ সুজন, রাতুল, শাওন, মিকি মাউস, তোতলা সুমন, বাংলা সোহেল, হানিফ, সাইদুল সকলেই মন্টিদের বাসার ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। শিমু তখন ওই বাসার নীচে হাটাহাটি করতে থাকলে উপর থেকে সুজন সুমিকে দেখে সাইদুলকে বলে ‘বস শিমু পুলিশ নিয়া আমাদের ধরাইতে আসছে’। পরে তারা সুমিকে ধরে মন্টির বাসার ৬ষ্ঠ তলার ছাদের চিলে কোঠায় নিয়ে যায়। সবাই মিলে সুমিকে লোহার এঙ্গেলের সাথে নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধে। সুজন কাগজ মুড়িয়ে স্কসটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে বল বানিয়ে সুমির মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে মুখ বন্ধ করে। মন্টি জোর করে সুমিকে ইয়াবা সেবন করায়।
তিনি আরও বলেন, রাত আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে সুমিকে সাইদুল ও সুজন তাদের ছুরি দিয়ে গলায় পোচ দেয়। মন্টি তার বাসা থেকে চাপাতি এনে সুমির মাথাকে দেহ থেকে আলাদা করে। সুজন সুমির ডান পা কাটে। রাতুল বাম পা কাটে। সাইদুল ও বাংলা সোহেল ডান হাত কাটে। হানিফ বাম হাত কাটে। মিকি মাউস ছুরি দিয়ে সুমির পেটে আঘাত করে। বাংলা সোহেল ডান ও বাম হাত দুইটি ওয়াসার খালি জায়গায় ফেলে দেয়। সুজন ডান পা ও বাম পা হোটেল উপবন এবং মন্টির বাসার চিপায় ফেলে দেয়। মন্টি সুমির মাথাটা তার ঘর থেকে কেরোসিন তেল এনে আগুন দিয়ে পোড়ায় যাতে সুমিকে চিনতে পারা না যায়।
এরপর তারা সবাই চাদর দিয়ে সুমির দেহ পেঁচিয়ে ৬ষ্ঠ তলার ছাদ থেকে নীচে নামিয়ে ওয়াসার টিনশেড ঘরে টিনের উপর ফেলে দেয়। মন্টির ঘর থেকে বালতি-মগ এনে তোতলা সুমন ও আলম পানি দিয়ে রক্ত পরিস্কার করে। তখন ফজরের আজান দেয়। মন্টিকে বাসা থেকে কয়েকদিন বাইরে থাকতে বলে সাইদুল এবং অন্য সবাইকে গা ঢাকা দিতে বলে সাইদুল চলে যায়।