উপনিবেশ যুগের আরমানীটোলা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৫, ১১:৫০
 
ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি এনেছিল আরমেনিয়রা
ঢাকায় পশ্চিমা ধারার স্কুল—পোগজ স্কুল ওদের গড়া
সুপরিচিত ‘রূপলাল হাউস’ ওদের হাতে তৈরি
সোনালী আঁশ পাটকে দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছিল আরমেনিয়রা
বুড়িগঙ্গার তীরে পুরনো ঢাকার আরমানিটোলার এলোমেলো রাস্তাঘাটে, ঘিঞ্জি গলির আনাচে-কানাচে আয়েসি আড়মোড়া ভাঙ্গে এখনো তাদের দীর্ঘ স্মৃতি। ককেশীয় আর্মেনীয় বেনিয়ারা বিদায় হলেও তাদের আড়াই’শ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনচিত্র উত্কীর্ণ রয়ে গেছে আরমানিটোলায়। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে এখানে ডেরা বেঁধেছিল তারা। অতঃপর দেশ বিভাগকালে ধনাঢ্য প্রতাপশালী আর্মেনীয়রা রাশি রাশি সম্পদ নিয়ে চলে যায় ইরান, মধ্য এশিয়ায়। বাংলার পাট ও চামড়া শিল্পে ধসের কারণ ছিল তাদের এই পর্বের লুণ্ঠন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তুরস্কের অটোম্যানরা বা উসমানীয় শাসকরা আর্মেনিয়া জয় করার পর পারস্যের সাফাভি বংশ ষোড়শ শতকে আর্মেনিয়া আক্রমণ করলে স্বভূমিত্যাগী আর্মেনীয়রা নানাদেশ ঘুরে বাংলায় এস নোঙ্গর ফেলে। কালক্রমে, এখানে আর্মেনীয়রা আপন সম্প্রদায়ের বিস্তার ঘটায়। ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। এদেরই প্রত্যক্ষ মদদে ইংরেজরা পাকাপোক্ত আসন বিছিয়ে ছিলো এই বাংলায়। আর্মেনীয়রা ছিল ঔপনিবেশিকদের ‘দালাল’। ইংরেজদের সাথে আর্মেনীয়দের সখ্য ছিলো গলায় গলায়।  সে সময়টায় আর্মেনীয়রা যেমন ঢাকায় বাস করত, বাস করত কলকাতায়ও। আজও কলকাতায় গঙ্গার ধারে রয়েছে আর্মানিঘাট। এককালে ওই ঘাটেই আর্মেনীয়দের জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা করত। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে তারা খুব দাপটের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে গেছে। আলোর সঙ্গে যেমন মিলেমিশে থাকে অন্ধকার, শোষক-দালালদের মধ্যেও ভালো মানুষ ছিলেন কেউ কেউ। তাদের হাত ধরে ঝলমলিয়ে ওঠে শহর ঢাকা। পানি নিষ্কাশনের জন্য ধোলাই খাল কতক অংশে পুনঃখনন, তার ওপর সেতু নির্মাণ, বাকল্যান্ড বাঁধ, পোগজ স্কুল আর রূপলাল হাউসের নির্মাণ তাদের হাতেই হয়েছিল কিংবা শুরু হয়েছিল। ১৮৩৭ সালে আর্মেনীয়রা ঢাকায় একটি ঘড়ি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৫৬ সালে তারাই চালু করেছিল ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি। ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে এই গাড়ি অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নবাবী মেজাজে এখনও ঢাকার বুকে দৌড়ে বেড়ায় ঘোড়ায় টানা টাঙ্গাগাড়ি। তাদের হাতে ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনেক জমিদারী। বহির্বিশ্বে পাট পরিচিত করে তোলে আর্মেনীয়রাই। লবণ, পাট, নীলসহ অনেক ব্যবসায়েই একচেটিয়া ছিল তারা। পশ্চিমে নবাবগঞ্জ, পূর্বে গেন্ডারিয়া, লোহারপুল, উত্তরে ফুলবাড়িয়া এবং দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা-এ সীমানা নিয়েই ছিল সেকালের নগরী ঢাকা। কালের বিবর্তনে ঢাকার পরিধি বেড়েছে। কিন্তু পুরনো ঢাকার আরমানিটোলা বেশকিছু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। আর্মেনীয়রা যেখানেই যেতো গির্জা তৈরি করত। আরমানিটোলার বিখ্যাত আর্মেনীয় গির্জা তারা  ১৭৮১ সালে নির্মাণ করেছিল । নাম ছিল ‘চার্চ অব হোলি রেজারেকশন’। লোকে বলে আরমানিটোলার গির্জা। এই গির্জা ঘিরে আছে আর্মেনীয় সমাধিক্ষেত্র, যা তাদেরকে এখনো এদেশে পরিচিতির পাদপ্রদীপে রেখেছে। কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এখানে প্রতিটি দেয়ালের গায়ে, কবরের ফলকে জড়িয়ে আছে তাদের অজস  স্মৃতিচিহ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ভিতরেও আছে আর্মেনীয় একটি ছোট গির্জা। আরমানিটোলায় ২২৪ বছরের পুরনো  আর্মেনীয়ান সিমেট্রি অযত্নে-অবহেলায় ধ্বংসের পথে। বাংলার অন্যতম বৃহত্ এই খ্রিষ্টিয়া সমাধিক্ষেত্রটি তত্কালীন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও তাদের পরিজনদের জন্য নির্ধারিত ছিল। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় লালবাগ দুর্গে নিহত ইউরোপীয় সৈনিকদের সমাধিও এই আর্মেনীয় সমাধিক্ষেত্রে আছে।
শেকড়ের সন্ধানে-
তুরস্কের ঠিক পুবের দেশটাই আর্মেনিয়া। আর্মেনিয়ার উত্তরে জর্জিয়া, পুবে আজারবাইজান এবং দক্ষিণে ইরান। ভৌগোলিকভাবে আর্মেনিয়ার অবস্থান দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইরেভান, এর মাত্র ২৫ মাইল দূরে তুরস্কের পূর্বসীমান্ত। একসময় তুর্কি অটোম্যানদের অধীন ছিল আর্মেনিয়া। ইরেভান শহর থেকে একটা পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়। সে পাহাড়ের নাম আরারাত। কথিত আছে,
মহাপ্লাবনশেষে হযরত নুহ (আ.)-এর  নৌকা বা আর্কটি ওই আরারাত পাহাড়েই ঠেকেছিল। ঐতিহাসিকরা খুঁজে পেয়েছেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে আর্মেনীয়দের পূর্বপুরুষরা বাস করতো আরারাত পাহাড়েই। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে আর্মেনীয়দের প্রথম রাজার নাম টিগরানেস। তার সাম্রাজ্য ভূমধ্যসাগর অবধি ছড়িয়ে ছিল। তারপর এক সময়ে রোমানদের দখলে চলে যায় আর্মেনিয়া। এরপর আর্মেনিয়া শাসন করে পার্থীয়রা। পার্থীয়রা পারস্যও শাসন করতো। এরপর পারস্যে সাসানীয়রা ক্ষমতায় আসে। আর্মেনিয়াও সাসানীয়দের অধীন হয়ে পড়ে। সে সময় আর্মেনিয়ার রাজা ছিলেন ৩য় টিরাইদেস। ইনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে, খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করেন। বিশ্বের ইতিহাসে আর্মেনীয়রাই প্রথম খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দিয়েছিল। ৭ম শতকে আর্মেনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাইজানটাইন শাসন। এরপর আরবি অশ্বারোহীরা ঢুকে পড়ে আর্মেনিয়ায়, আর্মেনীয় অভিজাতদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত করে আর্মেনিয়ার শাসক। তারপর থেকে আর্মেনীয় বাগরাতুনি রাজবংশ শাসন করে আর্মেনিয়া। তবে তারা আরবদের কর দিত। এভাবে কার্যত স্বাধীনই ছিল আর্মেনিয়া। এরপর আবার কিছু সময়ের জন্য বাইজানটাইন শাসনের অধীন হয়ে পড়ে আর্মেনিয়া। একাদশ শতকে সেলজুক তুর্কিরা দখল করে দেশটা। ১৩ শতকে মঙ্গোলরা আক্রমণ করে আর্মেনিয়া। ১৫ শতক অবধি অঞ্চলটা ওরাই শাসন করে। এরপর তুরস্কের অটোমানরা আর্মেনিয়া অধিকার করে। পারস্যও আর্মেনিয়ার কিয়দংশ শাসন করত। পারস্যের সাফাভি বংশ ষোড়শ শতকে আর্মেনিয়া আক্রমণ করলে অনেক আর্মেনীয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদেরই একদল নানাদেশ ঘুরে বাংলায় এসেছিল।
ঢাকায় আর্মানি সম্প্রদায়
আর্মেনীয়রা কেন বাংলায় এসেছিল সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আর্মেনীয়দের সঙ্গে পারস্যবাসীর সম্পর্কের ঘনিষ্ঠ বন্ধন কয়েক সহস্রাব্দের। খ্রিস্টের জন্মের ৫শ’ বছরেরও আগে থেকে এই দুই জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বাণিজিক সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয়র বাস ছিল পারস্যে। সাফাভি রাজবংশ কর্তৃক ককেশাসের পূর্ব আর্মেনিয়া বিজয়ের পরে বাদশাহ শাহ আব্বাস প্রায় ৪০,০০০ আর্মেনীয় ব্যবসায়ীকে ইস্পাহান ও নয়া জাফাতে নির্বাসনে পাঠান। সেখান থেকে ইরানি অভিযাত্রীদের সাথে এই ব্যবসায়ীদের অনেকে প্রথম বারের মতো বাংলায় আগমন করেন। ষোড়শ শতক থেকেই বাংলায় আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি শুরু হয়। এই ব্যবসায়ীরা মূলত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। আর্মেনীয়দের গির্জার শিলালিপি হতে ধারণা করা যায় যে, তাদের আগমনের সূচনা সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে। আর্মেনীয়রা অষ্টাদশ শতকে ঢাকায় বস্ত্র ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে। রেশম বাণিজ্যে আর্মেনীয়রা গুজরাটি ও উত্তর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রধান প্রতিযোগী ছিল। পাট ব্যবসাতে তাদের আধিপত্য ছিল একচেটিয়া। আর্মেনীয়রা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলেছিল। তার মধ্যে শাঁখারীবাজারের ‘সিরকো এন্ড সন্স’ অন্যতম। এ দোকানে চা-সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় জিনিসপত্র বিক্রি হতো। মদ বিক্রির জন্য প্রতিষ্ঠিত ছিল ‘মেসার্স আনানিয়া এন্ড কোম্পানি’। আর্মেনীয়রা সবাই আরমানিটোলাতে বাস করতেন না, বরং মৌলভীবাজার ও নলগোলা এলাকাতে ছিল অনেকের বাস। আরমানিটোলার গির্জা নির্মাণের পূর্বে তারা ঐ এলাকায় একটি ক্ষুদ্র উপাসনালয়ে প্রার্থনা করতেন। তাদের কবরস্থান ছিল তেজগাঁর রোমান ক্যাথলিক চার্চে। সেখানকার অনেক কবরের শিলালিপিতে ১৭৪১ হতে ১৭৯৫ পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখ দেখা যায়।
ইতিহাসে দেখা যায়, ঢাকাতে প্রথম তারা বসতি স্থাপন করেন ‘শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে’ তেজগাঁও এলাকায়। সেখানে তারা সুন্দর একটি গির্জা নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে তারা আরমানিটোলা এবং নগরীর অন্যান্য স্থানে প্রাসাদোপম অনেক ভবন গড়ে তোলেন। আরমানিটোলার গির্জাতে ‘হোলি রিজারেকশন’ বা পবিত্র পুনরুত্থান তালিকায়  ১৮৩৩ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে ২০০টি মৃত্যু, আড়াইশ’ ব্যাপ্টিজম এবং অর্ধশতাধিক বিবাহ নিবন্ধনের উল্লেখ আছে। ১৮৩৭ সালে আর্মেনীয় গির্জায় একটি ঘড়ি স্তম্ভ নির্মাণ করেন তারা, যা ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধসে পড়ে। ১৮৬৮ সাল নাগাদ ঢাকার ছয়জন ইউরোপীয় জমিদারের পাঁচজনই ছিলেন আর্মেনীয়। এরা হলেন জেজি নিকোলাস পোগোজ (নিকি পোগোজ নামে পরিচিত), জিসি পানাতি, জে স্টেফান, জেটি লুকাস এবং ডব্লিউ হারনি।
স্থাপত্য শিল্পে আর্মেনীয়দের সুনাম বিশ্বজুড়ে। পুরান ঢাকার সুন্দর  ভবন হিসাবে পরিচিত যে ‘রূপলাল হাউস’, সেটির আদি মালিক ছিলেন আরাতুন নামে এক আর্মেনীয়। ঢাকায় প্রভাবশালী আরমানিয়ান নাগরিক এই আরাতুন ছিলেন ঢাকা জার্নাল স্কুলের অধ্যক্ষ। মোরগ লড়াই ও পায়রা উড়ানোর কারণে ঢাকাবাসীর কাছে ‘শৌখিন আরাতুন’ নামে পরিচিত ছিলেন। আর্মেনীয় জমিদার নিকি পোগজ ছিলেন সমাজসেবক। বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পোগজ স্কুলটি তার স্মারক হিসাবে রয়েছে আজো। ওয়াইজঘাটে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি যে ভবনে অবস্থিত, সেটির মালিকও ছিলেন নিকি পোগজ। মানুকের বাড়ি ছিল সদরঘাটে। আনন্দ রায় স্ট্রিটে ছিল স্টেফানের প্রাসাদ, তাজমহল সিনেমাহল ছিল পানিয়াটির অট্টালিকা, বাবুবাজার পুলের উত্তর পশ্চিমে ছিল কাচাতুরের বাড়ি।
উনিশ শতকের শেষভাগে আর্মেনীয়দের প্রভাব কমতে শুরু করেছিল। তাদের অনেকেরই জমিদারি হাতছাড়া হয়, অনেকেই কলকাতা চলে যান। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও দিন দিন খারাপ। আরাতুনের উত্তরাধিকারীরা খাজা আজিমুল্লাহর কাছে জমিদারি বিক্রি করে কলকাতায় পাড়ি জমায়। লুকাস জমিদারি বিক্রি করেছিলেন আনন্দচন্দ্র রায়ের কাছে। পোগজ জমিদারি বিক্রি করে লন্ডন চলে যান। এ ছাড়া অনেকেই তাদের পেশা পরিবর্তন করেছিলেন এবং ঢাকায় আর্মেনীয়র সংখ্যা কমতে থাকে।
ঔপনিবেশিক দালাল
সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই আর্মেনীয়রা বাংলায় ব্যবসা করত। সে সময়টায় বাংলার নগরে বন্দরে সর্বত্রই আর্মেনীয়দের দেখা যেত। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেত, লাভের আশা থাকলে, যেখানে অন্যরা যেত না। বাংলার নদী-উপকূলে তখন ইংরেজ বেনিয়াদের জাহাজ ভিড়ে আছে। বাংলায় তারা ব্যবসা করবে। সে জন্য স্থানীয় অংশীদার খুঁজছিল। ইংরেজদের ছিল পুঁজি ও ব্যবসায়িক দক্ষতা। এখন তাদের দরকার স্থানীয় ধনিক শ্রেণির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আর্মেনীয়রা মধ্যস্থাকারীর ভূমিকায় এগিয়ে আসে। আর্মেনীয়দের ‘ওয়াকিল’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ করে ইংরেজরা। আর্মেনীয়রা ফার্সি বা পারস্য ভাষা জানত। যথাযথ পারিশ্রমিক পেয়ে আর্মেনীয় ওয়াকিলরা মোগলদের দরবারে গিয়ে বলে যে, কী উদ্দেশ্যে ইংরেজরা হিন্দুস্থানে এসেছে। ইংরেজদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা। কেননা ইংল্যান্ডে তখন বুর্জোয়া বিপ্লব হচ্ছিল। তাদের বিশাল বাজার চাই, পণ্যের জন্য বেশুমার কাঁচামাল চাই। সেজন্য চাই উপনিবেশ। চাই কলোনিয়াল দালাল। ‘ওয়াকিল’ আর্মেনীয়রা ছিল কলোনিয়াল দালাল। খোজাহ ফানোস কালানদার ছিলেন প্রথমদিককার ঢাকার ধনাঢ্য আর্মেনীয় ব্যবসায়ী। তিনি ইউরোপীয়দের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। ১৬৮৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেন কালানদার। চুক্তি অনুযায়ী কালানদার ও তার লোকেরা ইংরেজদের জাহাজ ব্যবহার করতে পারত। কালানদারের ভাতিজার নাম ছিল খোজাহ ইসরাইল সারহান্দ।
১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দ। বাংলার সুবেদার তখন প্রিন্স আজিম-উস-শান। খোজাহ ইসরাইল সারহান্দ বড় ঝানু লোক ছিলেন। কলকাতার ইংরেজদের জমিদারি পাইয়ে দিয়েছিলেন। ইংরেজরা বাংলার জমির জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল। এদের বিবেকে বাধেনি ইংরেজদের হাতে বাংলার জমিদারি তুলে দিতে। খোজাহ ইসরাইল সারহান্দ ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওয়াকিল। গিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়ারের দরবারে। ১৭১৭ সালে রাজকীয় ফরমান ঘোষণা করল মুঘল কর্তৃপক্ষ। তাতে বিস্তর সুযোগ ছিল ব্রিটিশ বেনিয়াদের। সে ফরমান ঘোষণায় সারহান্দের অবদান ছিল বেশি। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন খোজাহ ওয়াজিদ। সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার ক্ষমতা হারালেন। এ সময় নবাবের শত্রুদের সঙ্গে খোজাহ ওয়াজিদকে সুরাপান করতে দেখা যেত। ক্রমে ইংরেজরা বাংলাসহ ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। পলাশীর যুদ্ধের পর খোজাহ ওয়াজিদ মীরজাফরের কাছ থেকে একটি পরোয়ানা লাভ করেন যার অংশ হিসেবে তিনি সমগ্র পাটনায় সালপেত্রে ব্যবসার অধিকার লাভ করেন। এই সুবিধার বিপরীতে তিনি কোম্পানিকে স্বল্পমূল্যে লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা করে দেন।
কালের সাক্ষী আরমানিয়ান গির্জা
ঢাকার সে সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে আর্মেনীয় চার্চ তার অন্যতম। আর্মেনীয় চার্চটি আর সব চার্চ বা গির্জা থেকে একটু আলাদা। প্রতিটি চার্চ বা গির্জার কবর বা সমাধিস্থল আলাদা। কিন্তু আর্মেনীয় চার্চ পুরোটাই যেন সমাধিস্থল। আর সেসব সমাধি দামি মার্বেল পাথর দিয়ে গড়া। চার্চ অব দ্যা রিজারেকশন নামের আর্মেনীয় চার্চটির প্রতিটি দেয়ালের গায়ে, কবরের ফলকে জড়িয়ে আছে স্মৃতিচিহ্ন। প্রধান গেট দিয়ে তাকাতেই একটা ভাঙা হাততোলা শ্বেত পাথরের মূর্তি নজর কাড়ে। লোহার মোটা শিকের গেট পেরিয়ে মূর্তিটার নিচের ফলকে আরমোনিয়ান হরফে কয়েক ছত্র লেখা। তার নিচে ইংরেজিতে তার নিচে আবারও আরমানিয়ান হরফ এবং তার নিচের লাইনে ইংরেজিতে লেখা Rest in Peace। দৃষ্টিনন্দন এ মূর্তিটি চমত্কার কারুকাজ খচিত। আছে সারি সারি কবর। প্রতিটি কবরেই আর্মানীয়, ইংরেজি ও অন্যন্যা ভাষায় কিছু না কিছু লেখা আছে। মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করে স্বজনরা মৃতদের পরিচিতি খোদিত করে রেখেছে। ভাঙ্গা হাতের নারী মূর্তিটি সমাধির এপিটাফের ওপর দাঁড়িয়ে। মূর্তিটি ক্যাটচিক অ্যাভেটিক টমাসের সমাধির উপর স্থাপিত। ক্যাটচিক অ্যাভেটিক টমাসের স্ত্রী শ্বেতপাথরের মূর্তিটি কলকাতা থেকে আনিয়ে প্রিয়তম স্বামীর কবরে স্থাপন করেন। তার স্বামী মারা যান ১৮৭৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৫৬ বছর বয়সে।
১৮৮০ সালের দিকে আর্মানীয় গির্জার এ ঘণ্টাটি বন্ধ হয়ে যায়, যা আর কখনো বাজেনি। এক সময় এ গির্জার চারপাশ বেশ খোলামেলা ছিল। এত দালান কোঠা ছিলো না। দূর থেকেই গির্জা দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো আরমানিটোলা লোকবসতিতে ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। চারদিকে বিশাল সব অট্টালিকা আর্মেনীয় চার্চকে ঢেকে ফেলেছে।
ঢাকায় টিকে আছে দশ আর্মেনীয় পরিবার
দেশ বিভাগের পরে ঢাকায় আর্মেনীয়দের দুর্দিন নেমে আসে। নীল ও পাটের ব্যবসা সংকুচিত হতে থাকে। তখন নীলের সঙ্গে ১৩টি পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। আর্মেনীয়রা পাড়ি জমায় কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। গির্জাটি এখন দেখাশোনা করেন এম জে মার্টিন। ষাটের বেশি বয়সের মার্টিনের স্ত্রী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। তার তিন মেয়ের সবাই কানাডা প্রবাসী। তাঁদের মধ্যে দুইজনের বিয়ে হয়েছে আর্মেনীয় এবং একজনের পর্তুগিজের সঙ্গে। মার্টিন এখন সময় কাটান একা একা ধর্মকর্ম করে। মাঝে-মধ্যে সামাজিক কাজে অংশ নেন। তিনি জানালেন, তিনিই শেষ আর্মেনীয় নন। বাংলাদেশে এখনো ১০টি আর্মেনীয় পরিবার টিকে আছে। এর মধ্যে ঢাকায় আটটি এবং চট্টগ্রামে দুটি পরিবারের বাস। তাদের তিনজন কাজ করেন দূতাবাসে। বাকীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে ভালোই আছেন। মার্টিনের বাবার ছিল পাটের ব্যবসা। ২০ বছর আগে গির্জার দায়িত্ব বর্তায় তার কাঁধে। গির্জা এবং এর আরো কিছু বিষয়ের দেখাশোনা করে আর্মেনীয় সরকার। হংকংভিত্তিক আর্মেনীয় প্রশাসন এর দেখাশোনা করে।